ফারহান সাদিক (সংগ্রাম) এর আসন্ন বই ‘বারো ভূতের আঠেরো গপ্প’ ‘বঙ্গভূতের সঙ্গগুণে’ নিয়ে কোনো প্রকাশন কাজ করতে চাইলে যোগাযোগ করুন।

বিশ্বের জন্য রেনেসাঁ গর্বের নাকি দুঃখের?


ইউরোপ যখন সভ্যতার মুখ দেখেনি তখন সভ্যতার চূড়ায় ছিল সিন্ধু, মিসোপটমিয়া, ইনকা আর কাঁচা সোনার দেশ আফ্রিকা। তারপর শুরু হলো রেনেসাঁ, শিল্পবিপ্লবের সাথে সাথেই নতুন করে জন্ম নিলো নৈতিকতার সংজ্ঞা। ভেঙে পড়লো ধার্মিক মতাদর্শ। ইউরোপ দখল করতে শুরু করলো একে একে সব দেশ। ইউরোপিয় সাম্রাজ্যগুলো প্রতিযোগিতা করে লুট করতে থাকলো দেশ। মারতে লাগলো মানুষ। যুদ্ধবন্দিদের বিক্রি করতে লাগলো সদ্য জন্ম নেয়া শিল্পকারখানার মালিকদের কাছে। কৃতদাস প্রথা তার সর্বকালের মাত্রা ছাড়িয়ে গেল।
আরো দাস চাই। কলোম্বাসরা বেড়িয়ে পড়লো, আরো দাস জিম্মি করতে।
ধুলিতে মিশে গেল জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিখরে থাকা বাগদাদ-দামেস্ক। জ্ঞান-বিজ্ঞান পুরোপুরি হয়ে গেলো রোমানদের সম্পদ। অন্যান্য সভ্যতাকে করে দেয়া হলো অন্ধ।
দখলদারিত্বে আরেক ধাপ এগিয়ে এল ইংরেজ। ভারতবর্ষ লুট হলো, আফ্রিকার স্বর্ণ গায়েব হতে থাকলো, আমেরিকা থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিলো রেড ইন্ডিয়ারদের (এখন আমেরিকার যে সাদা চামড়ার মানুষ দেখেন তারা আসলে ইউরোপীয়দেরই বংশধর, আসল বাসিন্দা রেড ইন্ডিয়ানরা শ্বেতাঙ্গ ছিল না)। দুনিয়া জয় করে নিলো অক্সফোর্ড-হার্ভার্ড-ক্যামব্রিজ। দুনিয়াকে শিখাতে লাগলো শ্বেতাঙ্গরা শ্রেষ্ঠ। তারা যে ধরনের পোশাক পড়বে তা শ্রেষ্ঠ। তারা যে ধরনের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করবে তা শ্রেষ্ঠ। তারা যে লাইফ স্টাইল মানবে তাই আদর্শ জীবন। তারা যা শিখাবে তাই সেরা শিক্ষা। তারা আমাদের শিখালো ধনতন্ত্র, গণতন্ত্র, পরিবর্তনশীল আইন, নারীবাদ, নারী ক্ষমতায়ন, সমকাম। দখল দিলো আমাদের ব্যক্তিজীবনে।
হঠাৎ উত্থান হলো তাদের চেয়েও বড় এক ওয়্যার ক্রিমিনাল। হিটলার। হিটলারের সাথে যুদ্ধ করতে করতে দুর্বল হয়ে পরলো ইউরোপ। নিজেদের আসল ভিটেমাটি বাঁচাতে একে একে নিজেদের গুটিয়ে নিলো ইউরোপ। পৃথিবী পেল মুখোশ। তাদের ধারণা তারা স্বাধীন হয়ে গেছে।
তারা দেশ ছাড়লো ঠিকই কিন্তু ব্যবসা ছাড়লো না। অর্থনীতিকে রেখে দিলো নিজেদের তালুতে। সমাজতন্ত্র যেন সফল না হতে পারে এজন্য স্বর্ণমুদ্রা-রৌপ্যমুদ্রা-তাম্রমুদ্রা তুলে দিয়ে প্রচলন করলো কাগুজে মুদ্রা। বিশ্বকে দেখালো এতে খরচ কম এবং বহন সহজ। প্রতিষ্ঠা করলো বিশ্বব্যাংক। তাদের পাউন্ড আর ডলারেই চলতে বাধ্য করলো দুনিয়াকে। কিন্তু স্বর্ণমুদ্রা-রৌপ্যমুদ্রা-তাম্রমুদ্রার মূল্যমান ধাতুর দামের অনুপাতে বাড়লেও, কাগুজে মুদ্রার দাম ডলারের অনুপাতে কমতে থাকলো। ফলে অন্যান্য দেশের মানুষ সঞ্চয় করেও আর ধনী হতে পারলো না। অন্যান্য দেশের অর্থনীতির লাগাম রাখলো নিজের হাতে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো আপাত দৃষ্টিতে স্বাধীন হলেও হয়ে থাকলো তাদের কাছে জিম্মি। দখল না করেও তারা শাসন করতে শুরু করলো দুনিয়া। তাদের ক্ষমতা আরও দীর্ঘায়িত করতে পারমাণবিক বোমার ওপর জন্ম নিলো জাতিসংঘ। যাদের কাছে এই নিকৃষ্টতম হাতিয়ার আছে, কিন্তু তারা ঘোষণা করলো আর কেউ এই অস্ত্র বানাতে পারবে না। যুদ্ধ বন্ধ করতে তাদের এই উদ্যোগ, তারা বানিয়েছে চাঁদ উড়িয়ে দিতে। অন্যদের নজরদারীকে রাখতে পেন্টাগনের পাশের গড়ে উঠলো দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ডাটা সার্ভার। বিশেষ প্রয়োজনে এক্সেস পেলো সিআইএ-এফবিআর। তারা শুধু রাষ্ট্রের না প্রতিটা মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলাতে পারে ঐ মানুষটির অজান্তেই।
সারা দুনিয়াকে বাধ্য করা হলো, তাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা গণতন্ত্র মেনে নিতে। যারা মানে না তারা অসভ্য-বর্বর। তাদের দুনিয়ার স্বার্থে উড়িয়ে দাও, গুড়িয়ে দাও, দখল নাও। ওরা পাল্টা আক্রমণ করলে, ন্যাটো আছে। ওরা সামলাবে।
মজার ব্যাপার, বর্তমানে প্রচলিত পরোক্ষ গণতন্ত্রের জন্ম হয়েছিলো অশিক্ষিত সমাজে। সমাজে সবার যোগ্যতা মোটামুটি একই ছিল। ফলে যারা যোগ্য ছিল তারা বিরোধিতা করেছিল। এশিয়ায় তার আগেই গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নত রাষ্ট্র ব্যবস্থা ছিল। এই বাংলার কথাই ধরুন। এখানে গণতন্ত্র এসেছে ইংরেজ আমলে আর পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হবার কিছু আগে। সামরিক শাসনের সূচনা করে আইয়ুব খান, ইসলামি শরিয়াতন্ত্রে ও পরিবারতন্ত্রের মিশেল এক তন্ত্রে চালিয়েছে মোগলরা আর তার আগে রাজতন্ত্র। কিন্তু রাজতন্ত্রের শুরু হয় পাল রাজা গোপালের সময় থেকে। তাহলে তার আগে কিভাবে চলতো এই রাষ্ট্র? ভেবে দেখেছেন কখনো?
এটা কিন্তু পুরোপুরি মুছে ফেলা হয়েছে। আমি এর নাম দিতে চাই যোগ্যতাতন্ত্র। যে যোগ্য তার হাতেই তুলে দেয়া হতো রাষ্ট্র ক্ষমতা। এর উদাহরণ: শশাঙ্ক। তার পূর্বপুরুষ রাজা ছিল না, উত্তরপুরুষও না। তাহলে সে কিভাবে রাজা হয়েছে? নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতেই।
এই ভূখন্ডে শিক্ষার প্রচলন শুরু হয়েছিল আপনার-আমার চিন্তার চেয়েও আগে। মসলিনের মত শুধু উন্নতমানের ব্যবহার্য জিনিসপত্রই না, শিক্ষায়ও এগিয়ে ছিলো বঙ্গ। আমাদের পর্যন্ত অবশ্য সিন্ধু সভ্যতার আর্যভট্ট-ব্রহ্মগুপ্ত আর নালন্দা-বৌদ্ধমঠের কিছু স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই পৌছায়নি।
অশিক্ষিত ইউরোপ যখন যাকে তাকে রাজ্য ছেড়ে দিচ্ছে, তখন বঙ্গ ও সিন্ধু শিক্ষার ভিত্তিতে যোগ্য শাসক খুঁজে নিচ্ছিলো। কিন্তু আজ পৃথিবীতে যোগ্যতাতন্ত্র নেই, আছে ইউরোপীয় (বর্তমান হিসেবে আমেনিকান) দখলতন্ত্র।
গণতন্ত্রের আরেকটা উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা হলো, শিক্ষামন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী, রেলমন্ত্রী কোন পদ কে পাবে কোনো ঠিকঠিকানা নেই। সবাই একইভাবে নির্বাচিত হচ্ছে। আর যিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রী, পরের নির্বাচনে তাকে বাছাই করা হতে পারে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে। অনেকটা জিপিএ ফাইভ স্টাইল। কিন্তু সবার তো একরকম হলে চলবে না। যোগ্যতাতন্ত্রে উজির ‍ছিলো প্রধানমন্ত্রী, দেশের সবচেয়ে বুদ্ধিমান কুটনৈতিক। যোগ্যতাতন্ত্রে শিক্ষামন্ত্রীর সমমান ছিল রাজপণ্ডিত, ঐদেশের সবচেয়ে শিক্ষিত ব্যক্তি এবং তার অধীনে পরিচালিত হতো শিক্ষা। উজিরকে যদি রাজপণ্ডিতের দায়িত্ব দিয়ে দেয়া হয়, আর রাজপণ্ডিতকে বলা হয় উজিরগিরি করো, তাহলে তো গুবলেট হবেই।
ঐ তন্ত্রে সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবদান রেখেই নিজ যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্বাচিত হতো। কিন্তু গণতন্ত্রে সে হিসেব গেল উল্টে। অনেকে ভেবে পান না প্লেটোর মতো ব্যক্তি কেন গনতন্ত্রকে অযোগ্যের শাসনব্যবস্থা বলতেন।
গণতন্ত্রের ভিত্তেতেই গণতান্ত্রিক রাজা গ্যালিলিওকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। তার মৃত্যুর পাঁচশো বছর পর মানুষ জানতে পেরেছে সে সত্যবাদী ছিল। কোপার্নিকাসকেও বলি হতে হয়েছে গণতন্ত্রের।
এসব ভাবলে নজরুলের সেই কবিতাটা মনে পড়ে যায়।
“অসত্য যত রহিল পড়িয়া, সত্য যে গেল চলে
বীরের মত মরণকারারে চরণের তলে দলে।”
বিশ্বে যারা বারূদের গন্ধ ছড়ায় তারাই আবার বিশ্ব শান্তির গান শোনায়। আর আমরা লাশের মত বেঁচে আছি। আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য চোরদের মত হবার স্বপ্ন দেখি।

জনপ্রিয় পোস্টগুলো

ফারহান সাদিক (সংগ্রাম) এর লেখা বইগুলো