পোস্টগুলি

সাহিত্য বিশ্লেষণ লেবেল থাকা পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে
ফারহান সাদিক (সংগ্রাম) এর কাব্যগ্রন্থ ‘আগুনের গান ও অন্যান্য’ আর ‘গোরস্তানের দারোয়ান’ নিয়ে কোনো প্রকাশনী কাজ করতে চাইলে যোগাযোগ করুন।

সংস্কৃত যুগের হারিয়ে যাওয়া এক ছন্দ

গত কয়েকদিন বিভিন্ন ধরনের ছন্দ নিয়ে লেখছি। একটা ছন্দ নিয়ে না লেখলে এই ছন্দ বিষয়ক লেখাটা হয়তো অপূর্ণই থেকে যাবে। বঙ্কিম থেকে রবীন্দ্রনাথ ঐসময়ের সব এলিট সংস্কৃত পাঠকের মনে দাগ কাঁটা এক ছন্দ- মন্দাক্রান্তা। বাংলায় নামের অর্থ দাঁড়ায় মন্থরগতির ছন্দ।  এই ছন্দে লেখা কবিতা চাইলেই দ্রুত পড়তে পারবেন না, তাই এমন নাম। এই মন্থরগতি  দুঃখকে   অনেক ভারি করে তুলতে পারতো। কিন্তু এই ছন্দের পূজো করলেও কেউ পুরোপুরি এই ছন্দটাকে বাংলা সাহিত্যে নিয়ে আসতে পারেনি। এর কারণ বলা হয়, বাংলা অনেক সরল ভাষা। রবীন্দ্রনাথ মন্দাক্রান্তার অনুকরণে নিজস্ব ছন্দ তৈরির চেষ্টাও করেছিলেন। যেখানে রবীন্দ্রনাথের সেই ছন্দ মন্থর হয়ে যায় ঠিকই কিন্তু  মন্দাক্রান্তা  ছন্দ কাঠামোর সাথে তার হুবুহু মিল ছিল না। যদিও রবীন্দ্রভক্তরা দাবি করেন, রবীন্দ্রনাথ আগের  মন্দাক্রান্তা ছন্দের  নিয়ম ভেঙে মন্দাক্রান্তা ছন্দকে বাংলায় নতুন রূপ দিয়েছে। আসল মন্দাক্রান্তা ছন্দের দল সংখ্যা  মন্দাক্রান্তা ছন্দ সংস্কৃতের এক জটিল ছন্দ। ব্যাকরণে খুব কড়াকড়ি। বর্তমানের হিসেবে স্বরবৃত্তের একটা ক্যাটাগরি। ছন্দের হিসেবে ১৭ দলে...

বাংলা মহাকাব্য

ছবি
মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন বাংলায় প্রথম মহাকাব্য রচনা করেন তারপর থেকে কবিদের একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়।  কে মহাকাব্য লিখতে পারে, এটা এক বড় যোগ্যতা? এ উন্মাদনা পরবর্তী ৬ দশকের বেশি সময় ধরে চলেছিল। রবীন্দ্রনাথও যে একসময় মহাকাব্য লেখার চিন্তা করেছিলেন সে ব্যাপারে তো সে তার পঞ্চভূতে বলেছেনই। অনেকেই শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত সফলতা পেয়েছিলো খুব কম মহাকাব্যই। আমার অনুসন্ধান মতে মাত্র ১২টি। আর মহাকবি মাত্র ৯ জন। তারা হলেন- মাইকেল মধুসূদন দত্ত,  হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়,  হরিমোহন মুখোপাধ্যায়,  নবীনচন্দ্র সেন, মানকুমারী বসু, মোজাম্মেল হক, কায়কোবাদ,  ইসমাইল হোসেন সিরাজী ও যোগীন্দ্রনাথ বসু। বাংলা সাহিত্যের মহাকাব্যের টাইমলাইনকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলা যায়।  → পৌরাণিক মহাকাব্যের যুগ ১৯ শতকের শেষ ৪ দশক ( ১৮৬১-১৯০০ সাল) ১. মেঘনাদবধ কাব্য-মাইকেল মধুসূদন দত্ত ২. বৃত্রসংহার ( দুই খণ্ড )-হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ৩. মুকুট উদ্ধার -হরিমোহন মুখোপাধ্যায় ৪. বীরকুমার বধ কাব্য - মানকুমারী বসু   ৫ . রৈবতক-নবীনচন্দ্র সেন ৬. কুরুক্ষেত্র-নবীনচন্দ্র সেন   ৭. প্রভা...

বাংলা সাহিত্য ও শরীরতত্ত্ব

ছবি
‘আট কুঠুরি নয় দরজা’ নামটা যেকোনো পাঠকের কাছের অতি পরিচিত। কেন হবে না, এটা সমরেশ মজুমদারের মাস্টারপিস। তবে বইটা মৌলিক হলেও নামটা মোটেও মৌলিক না। নামটা তিনি নিয়েছেন লালনের ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’ গান থেকে। গানটা ছিল- “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়? ধরিতে পারলে মনবেড়ি দিতাম পাখির পায়। আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা    মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা তার উপরে সদর কোঠা আয়না-মহল তায়। কপালে কি আছে জানি না    পাখিটি আমার বশ মানিল না কোন দিন খাঁচা ছেড়ে পাখি কোন বনে পালায়। ওরে মন তুই খাঁচার আশে    খাঁচা যে তোর তৈরি কাঁচা বাঁশে কোন দিন খাঁচা পড়বে খসে লালন কেঁদে কয়।” লালনের এটা একটা আধ্যাত্মিক গান। যেখানে পাখি বলতে তিনি প্রাণ বুঝিয়েছিল তা সবারই জানা। কিন্তু আট কুঠুরি আর নয় দরজাটা কি? আসলে লালন এখানে আট কুঠুরি বলতে আমাদের শরীরের আটটা আবশ্যক অভ্যন্তরীণ অঙ্গের কথা বলেছিলেন। এগুলো হলো- মগজ (যেটাকে পরবর্তীতে তিনি সদর কোঠাও বলেছিলেন), হৃদপিন্ড, দুই ফুসফুস, পাকস্থলি, মুত্রথলি ও দুই কিডনি। এগুলোর প্রতিটিই মানুষের বেঁচে থাকতে আবশ্যক। লালন বলছে এই আট কুঠুরির ম...

শতাব্দির আর্তনাদ

ছবি
আমাদের শৈশবে ঘুম পাড়ানি ছড়ার অর্থ মোটেই আমাদের শৈশবের মতো আনন্দময় ছিল না। এটা কোনো ছেলে ভুলানো ছড়া হবার কথাই ছিল না, এটা অনাচারের বিরুদ্ধে এক কবির প্রতিবাদ। সম্ভবত ছড়াটি মানুষের মনে গেঁথে গিয়েছিল বলে যুগ-যুগ ধরে মায়েরা অর্থ না বুঝেই এ গানে ঘুম পাড়িয়ে আসছে সন্তানকে। আমার মনে হয় না অর্থ জানার পর কোনো মা তার সন্তানকে এ ছড়া শুনিয়ে ঘুম পাড়াতে পারবে।  যাই হোক, ছড়াটি ছিল এমন—  ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গী এল দেশে বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেব কিসে? ধান ফুরল, পান ফুরল, খাজনার উপায় কি? আর ক’টা দিন সবুর কর, রসুন বুনেছি। ধনিয়া-পিয়াজ গেছে পচে, সর্ষে ক্ষেতে জল খরা-বন্যায় শেষ করিল বৎসরের ফসল। ধানের গোলা, চালের ঝুড়ি সব শুধু খালি, ছিন্ন কাপড় জড়িয়ে গায়ে শত শত তালি। ধানের গাছ, বিলের মাছ যাই কিছু ছিল নদীর টানে বাঁধটি ভেঙ্গে সবই ভেসে গেল। এ বারেতে পাঁচ গাঁয়েতে দিয়েছি আলুর সার আর কটা দিন সবুর করো মশাই জমিদার। এবার ব্যাখ্যা করি— “ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো বর্গী এল দেশে।” বর্গী ছিল মারাঠি দস্যুদল। মগদের মত তারাও কোথাও আক্রমণ চালালে মানুষ মেরে, লুটপাট করে সারা পাড়া বিরাণ করে দিতো। সেখানে কথক ...

এআই আর আমার মেঘদূত বিষয়ক আলোচনা

ছবি
  (রবীন্দ্রভক্তদের কাছে শুরুতেই ক্ষমা চাচ্ছি। তাকে ছোট করা এখানে উদ্দেশ্য না। তিনি বাংলা সাহিত্যের মহাকাব্য বাদে প্রতিটি ক্ষেত্রেই অবদান রেখেছিলেন যা বাংলা সাহিত্যে বিরল।) আমি:  মেঘদূতের মত মন্দাক্রান্ত ছন্দ কি আধুনিক কোনো বাংলা কবি ব্যবহার করেছে? এআই: আধুনিক বাংলা কবিদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বুদ্ধদেব বসু মন্দাক্রান্তা ছন্দের সবচেয়ে সার্থক এবং নিপুণ ব্যবহার করেছেন। তবে মনে রাখা ভালো, সংস্কৃতের 'অক্ষরবৃত্ত' (মাত্রার ওজন অনুযায়ী) আর বাংলার 'অক্ষরবৃত্ত' (অক্ষর গণনা অনুযায়ী) কিছুটা আলাদা। বাঙালি কবিরা মন্দাক্রান্তার সেই ৪+৬+৭ এর রাজকীয় ঢঙটিকে বাংলায় অভিযোজিত করেছেন। এখানে প্রধান কয়েকজনের উদাহরণ দেওয়া হলো: ১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (সবচেয়ে সফল প্রয়োগকারী) রবীন্দ্রনাথ কালিদাসের 'মেঘদূত' এবং মন্দাক্রান্তা ছন্দের প্রেমে পাগল ছিলেন। তিনি সরাসরি মন্দাক্রান্তার ১৭ অক্ষরের কাঠামো ব্যবহার করে বেশ কিছু কবিতা লিখেছেন। তাঁর 'মানসী' কাব্যগ্রন্থের 'মেঘদূত' কবিতাটি এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ: "কোথা হতে আচম্বিতে / এল আজি এ শ্রাবণ-দিবসে / সহসা মেঘের ঘনঘটা। / গ...
FS Quote