রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ‘আমাদের ছোট নদী’
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত এক কবিতা ‘আমাদের ছোট নদী’। এটা শুধুই কি ছেলে ভুলানো ছড়া নাকি নিজের ও নিজের সমাজের প্রতিই কবির উপহাস?
কবিতাটি বিশ্লেষণ করা যাক। তবে আগেই বলে দেই এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত।
“আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাটু জল থাকে।
পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি,
দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।”
সাধারণভাবে যদিও এর অর্থ দাঁড়ায়, আমাদের ছোট নদীটা আঁকাবাঁকা হয়ে চলে গেছে। বৈশাখ মাসে তার পানি কমে হাটু সমান হয়ে যায়। গরু ও গরুর গাড়ি পার হচ্ছে নিয়মিত, যদিও তার দুই ধার উঁচু এবং পাড় ঢালু।
যাদের ফেঁসে যাওয়া গাড়ি ঠেলার অভিজ্ঞতা আছে তারা জানে, মানুষ সচরাচর ঐ পথে যায় না যে পথে ফেঁসে যাবার ভয় আছে। এতো মোটর গাড়ির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য আর সেটাতো গরুর গাড়ি।
দুই জোড়া চরণের মূল বিষয় দুটি হলো, ‘ছোট নদী’ ও ‘গরু’। গরু যেন আলাদাভাবে বোঝা যায় এজন্যই গরুর গাড়ি তিনি একসাথে লেখেনি। পুরোনো ইংরেজি রীতি অনুযায়ী এ দুটোর ইংরেজি করতে পারেন- ‘Ford’ ও ‘Ox’। হ্যা, অক্সফোর্ড নাম এ দুটো শব্দ থেকেই উৎপত্তি। অক্সফোর্ডের উদ্যত ষাঁড়েরাই দখলদার ইংরেজ বাহিনীর নেতৃত্ব দিতো, দখল করতো দেশের পর দেশ, যুদ্ধবন্দিদের বিক্রি করতো শিল্পবিপ্লবে জন্ম নেয়া কলকারখানার মালিকদের কাছে ক্রিতদাস হিসেবে।
হ্যা, বৈশাখ মাসে তীব্র গরমে আমাদের যে জাতির দূর্ভিক্ষ লেগে যেত সেই জাতির উপর দিয়েও চলে গেছে এই উদ্যত ষাঁড়েরা। তবে একা যায়নি। তাদের সাথে গেছে গাড়ি। আর তার যাত্রি হয়ে গেছে বিলেতের স্বপ্নে বিভোর স্বদেশীর দল। কবি বলেছেন, তার দুই দিক শ্রেণিবৈষম্যে উচু আর তার পাড়ও অনেক ঢালু; অনেক টাকার মামলা।
“চিক চিক করে বালি, কোথা নেই কাঁদা,
একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।”
সাধারণভাবে অর্থ দাঁড়ায়, নদীর বালি চিকচিক করে কোথাও কাঁদার অস্তিত্ব নেই। একপাশে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।
কখনো কি ভেবেছেন যে সরু নদীর ওপর দিয়ে গরু-গাড়ি নিত্য চলছে সেখানে কাঁদা থাকবে না কেন? আমাদের তো বৃষ্টির পানি জমা রাস্তায় চলতেও কষ্ট হয়ে যায় কাঁদার জন্য।
এটাও মূলত রূপক। বিলেত ফেরতাদের আলাদাই একটা ওজন ছিল সমাজে। তাদের কোনো কাঁদা তথা দোষ পেতো না সমাজ। আরেকদিকে তো তাদের পেতে হা করেই আছে কাশবনের মতো জুড়ে বসা শ্বেতাঙ্গরা। তাদের সাথে মতবিনিময় তুলনামূলক সহজ হওয়ায়, প্রজাদের ওপর খবরদারি চালাতে তারাই ছিল ইংরেজদের মোস্ট ফেবারিট।
”কিচিমিচি করে সেথা শালিকের ঝাঁক,
রাতে ওঠে থেকে থেকে শেয়ালের হাঁক।”
সাধারণভাবে অর্থ দাঁড়ায়, কাঁশবনে শালিকের ঝাঁক কিচিমিচি করে আর রাতে শোনা যায় শিয়ালের ডাক।
রূপক ব্যাখ্যা করলে, শ্বেতাঙ্গদের থেকে একদল শালিক সবসময় হৈ-হুল্লোড় আমোদ-ফূর্তিতে মেতে থাকে। মাঝেমধ্যে আবার রাতের অন্ধকারে শোনা যায় শিয়ালের হুক্কাহুয়া। অন্ধকারে লুটে নেয় স্বদেশীদের সম্পদ।
“আর-পারে আমবন তালবন চলে,
গাঁয়ের বামুন পাড়া তারি ছায়াতলে।”
সাধারণভাবে অর্থ দাঁড়ায়, আড়াআড়ি চলে গেছে আমবন-তালবন। তারই নিচে ব্রাহ্মণদের পাড়া।
সাধারণত নদীর আড়াআড়ি কোনো বন হয় না। হয় কোনো এক পাড়ে, দুই পাড়ে কিংবা কিছুটা দূরে। কিন্তু কবি বলেছেন আড়াআড়ি চলে যাওয়া দুটো-বনের ব্যাপারে। আমবন আর তালবন। স্বদেশ থেকে আড়াআড়ি ইংরেজদের দুয়ার পর্যন্ত চলে গেছে দুটো দল। একদল আমের মত মিষ্টি স্বভাবের; শ্বেতাঙ্গদের প্রেমে অন্ধ। আরেকদল তাল; তাদের মূল পাকাপোক্ত; সমাজের শাসকগোষ্ঠি। যার মধ্যে কবি নিজেও পড়তেন। যাদের ছত্রছায়ায় তখন সুবিধার আশায় আশ্রয় নেয় ব্রাহ্মণ সমাজ।
“তীরে তীরে ছেলে-মেয়ে নাইবার কালে
গামছায় জল ভরি গায়ে তারা ঢালে।
সকালে বিকেলে কভু নাওয়া হলে পরে
আঁচল ছাঁকিয়া তারা ছোটো মাছ ধরে।”
সাধারণভাবে অর্থ দাঁড়ায়, নদীর পাড়ে দলে দলে ছেলেমেয়েরা গামছায় পানি ভরে গায়ে ঢেলে গোসল করছে। সকালে বা বিকেলে কখনো গোসলের পরে আঁচলে ছেঁকে তারা গুড়া মাছ ধরে।
গোসলের সময় গামছা দিয়ে কখনো গায়ে পানি ঢেলেছেন? কতটুকুইবা পানি ধরে রাখতে পারে গামছা? কবি এখানে ইংরেজ প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলেছে। ছেলে-মেয়েরা গামছায় করে শুধু শিক্ষা ঢেলেই যায়। তাতে তাদের উপকার হয় সামান্যই। কেউ কেউ নিয়ম ভাঙ্গে। একটা ভালো বেতনের আশায়, কিছু সুবিধা ভোগ করতে কেউ কেউ প্রকৃত বয়সের আগে-পরেও এই ঢেঁকি গিলে।
“বালি দিয়ে মাজে থালা, ঘটিগুলি মাজে,
বধূরা কাপড় কেঁচে যায় গৃহকাজে।”
সাধারণ অর্থে, বালি দিয়ে বধুরা থালা-ঘটি মেজে, কাপড় ধুয়ে বাড়ির কাজে চলে যায়।
রূপক অর্থে, তাদের পতির দাম চড়া হলেও, একই বালিতে থালা-ঘটি মেজে, কাপড় ধুয়ে বাড়ির কাজে চলে যায় বধুরা। অর্থাৎ বাস্তবিক অর্থে সামাজিক কোনো উন্নতি হয় না। একইভাবেই চলতে থাকে জনজীবন।
“আষাঢ়ে বাদল নামে, নদী ভর ভর
মাতিয়া ছুটিয়া চলে ধারা খরতর।
মহাবেগে কলকল কোলাহল ওঠে,
ঘোলা জলে পাকগুলি ঘুরে ঘুরে ছোটে।
দুই কূলে বনে বনে পড়ে যায় সাড়া,
বরষার উৎসবে জেগে উঠে পাড়া।”
সাধারণভাবে অর্থ দাঁড়ায়, আষাঢ়ে বৃষ্টি নামে। পানিতে ভরে নদী হয়ে উঠে খরস্রোতা। ঢেউয়ের কলকল শব্দে মুখোড় হয় নদী। পানির পাক ঘুরে ঘুরে এগিয়ে যায়। এই আনন্দ নদীর সাথে সাথে নদীর দু’পাড়েও ছড়িয়ে পরে। সবাই আনন্দে মেতে উঠে।
রূপক অর্থে, একটা মৌসুমে ছেলেগুলো বিলেত থেকে পাস করে ফিরে আসে। সারা পাড়া উৎসবে মেতে উঠে। সমাজের চোখে যারা পাকের মত ছিঃ ছিঃ করা তাদের মাঝেও জেগে উঠে আশার আলো। এবার দুঃখ ঘুচবে। দুই পাড়ের আমবন আর তালবন সম্প্রদায়দের মাঝেও খবর ছুটে যায়।