আমি এবং নির্বাচন
এ আর কি নির্বাচন! নির্বাচন হতো আমাদের স্কুল-কলেজে। কি পরিমাণ রাজনীতি যে সেখানে ছিল চিন্তা করতে পারবেন না।
আমি জীবনে কখনো নির্বাচনে জয়ী হইনি। স্কুল জীবনে নিজে থেকে দাঁড়াইও নাই। তো একবার ক্লাস সেভেন কি এইটে বন্ধুরা আমাকে জোর জবরদস্তি করে দাঁড় করিয়ে দিলো। মজার ব্যাপার হলো, আমার সেই একমাত্র নির্বাচনে আমি এক ভোটও পাইনি। নিজেরটাও না। কারণ আমার নিজের পক্ষে নিজেকে সাপোর্ট করাটা বিবেকে বাঁধছিল। যেহেতু একটাও ভোট পাইনি তাই আমি জেনে গিয়েছিলাম সবগুলোই পল্টিবাজি করেছে। পরে অজুহাত দিলো, “তোর পরে যে দাঁড়িয়েছে, ও না দাঁড়ালে সবাই ভোট তোকেই দিতো বিশ্বাস কর।” সেদিন প্রতারিত হয়ে আমার লুবাবার চেয়ে বেশি কান্না পেয়েছিল তা বলাই বাহুল্য।
তবে এটাই আমার প্রথম নির্বাচন না। আমি সবসময়ই যেহেতু শিক্ষকদের মোস্ট ফেভারিট ছিলাম। তাই ক্লাস থ্রি কি ফোরে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্যাপ্টেন বানিয়ে দিয়েছিল। দায়িত্ব সামান্যই কারা বিশৃঙ্খলা করছে তার নোট রাখা। আমার অবশ্য ঐদিন বাড়িতে ছুটি নিয়ে আগে চলে আসার কথা ছিল। এক ছেলেকে নাম লেখার দায়িত্ব দিয়ে চলে এলাম। ঐ দিনই ওদের মারামারি হবার ছিলো! আর ঐ ছেলেটাও আমার বিশ্বাসের মর্যাদা না রেখে, সালমান এফ রহমানগিরি করলো। পরেরদিন স্কুলে গিয়ে শুনি আমার ক্যাপ্টেন্সি ক্যান্সেল।
কলেজ জীবনেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্যাপ্টেন বানিয়েছিল। তা কলেজ ছাড়ার আগ পর্যন্ত যে বহাল ছিল, তার ফল আরো করুণ। আমাকে দেখে কারো আর ক্যাপ্টেন্সির সাধ জাগেনি তাই আমার পদত্যাগ গৃহীত হয়নি; শেষ পর্যন্ত সে সাজা খেটে যেতে হয়েছিল। আমার দায়িত্ব কলেজে সবার আগে গিয়ে মাইক্রোফোন চ্যাক করে রাখা; শিক্ষক আসতে ভুলে গেলেও আমার নিয়ে আসতে হবে। আমি বিনা বেতনে এ কাজ না করলে নাকি দায়িত্বে অবহেলা, তারা বেতন পেয়ে ক্লাসে আসবে না তা সামান্য ভুল। হতেই পারে। প্রফেসরদের সে ভুল করার অধিকার আছে, কারণ তাদের সাথে ঝামেলা করার ক্ষমতা আমাদের নেই।
শিক্ষক বলে অধ্যক্ষকে জানাতে ওয়ার ল্যাস মাইক্রোফোন দিতে, অধ্যক্ষ বলেন অন্যেরা যেভাবে ক্লাস নেয় সেভাবেই তোমাদের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদেরও ক্লাস নিতে হবে। আমি ছিলাম মহাফাপড়ে।
আনঅফিসিয়াল টর্চারও কম ছিল না। বেশিরভাগই নিয়মিত ক্লাসে আসতো না। যারা আসবে না তাদের সেই পুরোনো মেসেজ ‘আজ ক্লাসে কি পড়িয়েছে’। যদিও সে পড়া তারা কোনোদিন পড়তো কিনা আমার জানা নেই। পড়লে ফলাফলের এই দুর্গতি হতো না নিশ্চয়ই। তবে আমি কিছুক্ষণ অফলাইনে থেকে যখন মেসেজ চ্যাক করতাম তখন কি কি গালি যে আমার পড়তে হয়েছে তা আর মনে করতে চাই না। তাদের মনে হয় আমার তাদের জন্য বসে থাকা নৈতিক দায়িত্ব। তাদের মেসেজ না দেয়া মানে তাদের অমূল্যায়ন করা। অহংকার। আমার কোনো ব্যক্তি জীবন নেই।
সবাই ভাবে ওরা শিক্ষিত হয়, আমি জানি মানুষ বদলায় না। শুধু মুখোশে মুখ লুকায়। শিক্ষার মুখোশে। পেছনে কোনো তফাৎ নেই।
কলেজ জীবনে যে শিক্ষা পেয়েছিলাম তার ফলে অনার্স জীবনে আমাকে খোদ অধ্যক্ষ চাইলেও নির্বাচনে দাঁড় করাতে পারতো না।