ফারহান সাদিক (সংগ্রাম) এর আসন্ন বই ‘বারো ভূতের আঠেরো গপ্প’‘বঙ্গভূতের সঙ্গগুণে’ নিয়ে কোনো প্রকাশনী কাজ করতে চাইলে যোগাযোগ করুন।

পরীক্ষা ঘিরে আদর্শ ও গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা

আমার আত্মীয়-স্বজন চিন্তায় আছে ছেলেটার কি হলো, পড়াশোনা করছে না কেন!

আবার বন্ধুদের দাবি, পরীক্ষায় কারচুপি করতে না শিখলে সাত কলেজে পাশ আসবে না।

দুটো আপাত দৃষ্টিতে আলাদা ঘটনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো কতটা!

এটা আমার সামনে বসা শিক্ষার্থীর এক পরীক্ষার নকল। তিনটি খাতাই বলা যায়। পৃষ্ঠা যথাক্রমে ৩৬, ৩৪ এবং ৩০। মানে একটা গাইডের পাণ্ডুলিপিই এনেছে বলতে পারেন।
ওর নকল কিন্তু একদিনও ধরতে পারেনি শিক্ষক।

আর পরীক্ষায় কারচুপি করতে না শিখলে সাত কলেজে পাশ করতে পারবো না বলা ছেলেটা আমার পেছনে বসেছিল। ঐ বেটা অবশ্য তত প্রোফেশনাল ছিল না। একদিন নকল নিয়ে ধরা খেয়েছিল। শাস্তি শুধু নকলটা দেখে আর লেখতে না পারা এবং অন্য জায়গায় বসে পরীক্ষা দেয়া। তবে পরীক্ষক আরেকটা শাস্তি নিজের অজান্তেই দিয়েছিলেন। পরীক্ষককে দেখে তার ফোন আগের বেঞ্চেই লুকিয়ে ফেলেছিল সে। ফলে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের পরীক্ষা আগে শেষ হলেও তার ফোনের জন্য বাহিরে বসে থাকতে হয়েছে ঘন্টাখানেক।

মজার ব্যাপার, এই দুই নকলবাজের মধ্যে আমাকে চ্যাক করা হয়েছে দুইদিন। অথচ আমার সামনে-পেছনের দুই জনকে চ্যাক করা হলে যে কাগজ উদ্ধার হত তা কেজি দরে বিক্রি করতে পারতেন পরীক্ষক।

কি আর করা, সব চোরের মধ্য একজন ভালো মানুষ থাকলে সেখান থেকে একজন চোরকে খুঁজে বের করতে বললে সব থেকে সন্দেহজনক মনে হবে নিরীহ লোকটিকেই, এটাই স্বাভাবিক। একথাও আমার না। বন্ধুদের সূত্রে জানা, সাত কলেজের শতকরা ৮০ ভাগ শিক্ষার্থীই নাকি নকল নিয়ে আসে। এই ৮০ ভাগের বাহিরেও আরো কয়েকটি ক্যাটাগরির শিক্ষার্থীদের দেখা যায়। 

১. যারা দেয়ালে আল্পনা আঁকে।

২. যারা শিরিষ কাগজ দিয়ে বেঞ্চ পরিষ্কার করে।

৩. যারা টয়লেটকে মৌসুমী লাইব্রেরীতে রূপান্তর করে।

আপনি এই তিনটা অপশনের মানে বুঝেছেন, মানে আপনিও তাদের চেনেন, বা আপনি নিজেই তাদের একজন। তাই আর ব্যাখ্যা করলাম না। আর এতো শুধু দুজনের গল্প না, তাই শুধু দুজনের নাম প্রকাশও তাদের সাথে বৈষম্য করা হবে। এটা সমগ্র সাত কলেজের পরীক্ষার হলের চিত্র।

পড়াশোনা করি না কেন?

যখন দেখি ওরা পড়ালেখা না করেও আমাদের চেয়ে সমৃদ্ধ সনদ নিয়ে বের হচ্ছে তখন পড়তে ইচ্ছে করে না। আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। চোখ বন্ধ করলেই দেখি কেন বাংলাদেশ দুর্নীতিতে শক্ত অবস্থান অর্জন করে রেখেছে বহুদিন ধরে। আসলে দুর্নীতি শিক্ষিতরাই করে। অশিক্ষিতরা পণ্যে ভেজাল মিশাতে পারলেও ঘুষ-দুর্নীতিতে আবদান শুধু শিক্ষিত শ্রেণীরই। অশিক্ষিতরা বেশিরভাগ অজ্ঞতার কারণে করে আর তারা করে জেনে। 

এখানে বলে রাখি শিক্ষিত বলতে আমি সনদধারীদের বোঝাচ্ছি।

আমি গত বছর পরীক্ষা দেইনি যেসব কারণে,

  1.  আমার প্রিপারেশন খুব একটা ভালো ছিলো না। খুব বেশি কিছু শিখতে পারিনি এই ক্লাসগুলো থেকে। সিজিও হয়তো আগের চেয়ে কম আসতো।
  2. রমজানে কয়েকটি পরীক্ষা ছিল।
  3. ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনের ভেতর দিয়ে গাজীপুর-ঢাকা এক পরীক্ষায় কেন্দ্রে পৌঁছাতে দেরী হয় দু’ঘন্টা। আমাকে কেন্দ্রের বাহিরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় অনেকক্ষণ। তাদের মত, সিগনেচার শীট জমা দিয়ে দেয়া হয়েছে। ঐ পরীক্ষা আর দেয়ার সুযোগ নেই।
তবে কি অন্যদেরও আমার মতো পরীক্ষা না দেয়া উচিত?
না, একেবারেই না। আমার এবারের প্রস্তুতি আগের চেয়েও খারাপ ছিল। অনুশীলনের অভাবে পারা প্রশ্নগুলোর উত্তরও ভুল করেছি। 
এবার দুটো প্রশ্নের একটা উত্তর দেয়া যাক। আমি কখনোই চাকরি নিতে হবে এই পরীকল্পনা নিয়ে লেখাপড়া করিনি। আমি জানি আমি লেখালেখি করেও চাইলে আমার এই সামান্য খরচ তুলে ফেলতে পারবো। আমার কাছে আমার কাগুজে সনদের চেয়ে আমার ব্যক্তিত্ব ও আমার অর্জনকেই আমি সবসময় বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। এজন্য কেউ আমাকে কটাক্ষ করতে পারেন, কেউ আমাকে উপহাস করতে পারেন। কিন্তু আমি জানি আমি ঠিক। পুরো পৃথিবী অন্যদিকে থাকলেও আমি আদর্শের দিকে থাকবো। আমি নিজেকে আদর্শ বানানোর চেষ্টা করছি যখন থেকে আমি লেখালেখিতে কলম ধরেছি। আমি যদি আদর্শ ঠিক রাখতে না পারি আমায় কেন পরবর্তী প্রজন্ম তাদের আদর্শ মানবে? আমি ভবিষ্যতকে ভয় করি।
উপহাস আর পরিহাস শুধুই গণতান্ত্রিক দূর্বলতা। আজ কেন্দ্রগুলোতে পরীক্ষার বদলে ভোট করে দেখুন কতগুলো শিক্ষার্থী নকল করে পাস করতে চায়। দেখবেন নকল বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হবে। 
আগে বলেছিলাম এটা শুধু সাত কলেজের সমস্যা। উদ্দীপক সাত কলেজের হলেও পটভূমি সমগ্র বাংলাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে আশা রাখছি নতুন শিক্ষামন্ত্রী মিলন সাহেব এ সমস্যার শক্ত হাতে মোকাবেলা করবেন।
অতীততো তাই বলে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরীক্ষাতে হস্তক্ষেপ আমাদের অধ্যাপকদেরই করতে হবে।




মন্তব্যসমূহ

FS Quote

জনপ্রিয় পোস্টগুলো