আমার চোখে হিমু ও হুমায়ূন
হুমায়ূনকে নিয়ে যেমন সমালোচনা বেশি তেমনই তার হিমুকে নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি বেশি। এর জন্য দায়ী হুমায়ূন আহমেদ নিজেই। তিনি মৃত্যুর বর্ণনাও এমনভাবে লেখতেন যে পাঠকের মনে হবে— আহা কি দারুণ মৃত্যু! এমন মৃত্যুই তো চাই।
হিমুকে সবজায়গাতেই মহাপুরুষ হিসেবে উল্লেখ করেছে লেখক। কিন্তু সে কি আসলেই মহাপুরুষ? নাকি একজন সব হারানো ব্যক্তি? যে নিঃস্ব মানুষদের গণ্ডিতে ঘুরপাক খায়, কারো সাথে সম্পর্ক গড়তে ভয় পায়। সে নিজের জন্য একটা কাল্পনিক জগত তৈরি করে নিয়েছে। যেখানে সে মহাপুরুষ, সে মুখ দিয়ে যা বলে তাই সত্যি হয়ে যায়। পাঠকরা ফ্যান্টাসিতে ভোগে সেও হিমুর মত যা ইচ্ছে করতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো হিমু নিজে যা চায় তা কখনোই করতে পারে না। যেমন সে কোনোদিন তার মায়ের ছবিটা পর্যন্ত দেখতে পারবে না। কারণ তার বাবার শর্ত অনুযায়ী তা একবার দেখেই তাকে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। এমনকি তার বাবার এমন উদ্ভট শর্ত ভাঙার সাধ্যও নেই তার।
কেন তার সাধারণ জীবনযাপনে এত অনিহা? জানা যায়, তার প্রাথমিক জীবন কেটেছে সর্বাবস্থায় অন্যদের ক্ষতি করতে চাওয়া মামাদের আর একজন ভয়ংকর উন্মাদ বাবার সাথে। তাই তার বদ্ধ ধারণা, যে কিছু করে না সেই সবচেয়ে ভালো, সেই মহাপুরুষ। মহাপুরুষদের কোনো মায়া আটকাতে পারে না, পারে না কোনো নিয়ম-কানুন। এ জীবন থেকে বাঁচতে শুধু টাকাপয়সা না, জুতোর মায়া পর্যন্ত ছাড়তে হবে। তার উচিত শুধু কিছু করা থেকে বিরত থাকা যাতে সে কারো ক্ষতির কারণ না হয়।
তার ধারণা, তার মাকেও তার আধপাগল বাবাই মেরেছে, যেন সে মায়ের মমতায় জড়িয়ে না পরে। সে তার বাবাকে ঘৃণা করে কিন্তু তার বাবার কথাগুলো আজও পালন করে যাচ্ছে। যেন তার বাবা তাকে কষ্ট দিয়ে যে বাঁধন কেটে দিয়েছে, সে বাঁধনে জড়িয়ে সে আবার কষ্ট না পায়। তাই সে আজও তার বাবার কথামালা মেনে চলছে। সে এই জগতে উদ্দেশ্যহীন ঘুরপাক খায়, প্রেতের মত। কারণ তার বাবা নিজ হাতে তার সব সম্ভাবনাকে গলা টিপে মেরে গিয়েছে অনেক আগেই।
কিন্তু তবু সে বারবার অন্যদের সাথে মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে পরে, কষ্ট পায়। নিঃসঙ্গ হিমু বাদলের খোঁজে গিয়ে বাদলের বাবার থেকে যখন গালাগাল খায় তখন তা হেসে উড়িয়ে দেয়, কিন্তু সে ভুলতে পারে না। সে হাঁটতে থাকে। একাই।
সে রূপাকে অসম্ভব ভালোবাসে কিন্তু সে তাকে হারানোর ভয়ে কখনো সামনে গিয়ে দাঁড়ায় না। সে তাকে নীল শাড়ি পরে বারান্দায় দাঁড়াতে বলে। পরক্ষণেই মায়ার বাঁধনে আটকা পড়ছে বুঝতে পেরে পালিয়ে যায় সে। সে চায় না রূপা একজন সর্বহারা মানুষের মায়ায় জড়িয়ে তার বাকি জীবন নষ্ট করে দিক।
সে মারিয়ার প্রতিও দুর্বল হয়ে পড়ে। তার ইচ্ছে করে তার বাবার কথামালা ছুড়ে ফেলতে। কিন্তু মারিয়ার সে কৈশোর কেটে গেছে। তার আর এই পাগলাটে লোকটার জন্য কোনো আকর্ষণ নেই।
সে এত কাছে পাবার পরও তার রাশিয়ান পরীর হাত ধরতে পারে না, কারণ সে এই বাস্তবতা ছিঁড়ে পালাতে চায়। জানে তার সাথে কোন ভবিষ্যৎ নেই। তার আছে শুধুই তার ময়ূরাক্ষী নদীর মত একটা কাল্পনিক জগত। যেটা বাস্তবে নেই, কিন্তু সেখানে সে মুক্ত তার সে জগতে হারানোর ভয় নেই।
সে পুলিশের হাতে আটক হয়, আটক হয় র্যাবের হাতেও। কিন্তু তাকে আপন করে নেয় একমাত্র নিম্নবিত্ত মানুষেরাই। লেখক এমনভাবে গল্প সাজিয়েছে যেন আমাদের মনে হয় সে যা চায় তাই হয়ে যায় বলে নিম্নবিত্তরা তাকে পছন্দ করে, তাকে পীর মনে করে। কিন্তু তাদের মত এমন হলে, কেন তারা তাকে ধনী হবার জন্য বলে না? কারণ অতি সাধারণ। তাদের হিমুর কাছে কোন চাওয়া-পাওয়া নেই। নেই তার উপস্থিতি নিয়ে মাথাব্যথা। হতদরিদ্র বা ভিক্ষুকদের সাথে মিশে যায় সে খুব সহজে। যতটা সহজে মিশতে পারে না তাকে বিয়ে করিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে চাওয়া ধনী খালার সাথে। উদ্ভট উদ্ভট কথা বলে ও কাজ করে সে ঐ খালার ওখান থেকে পালায়। যাদের হারানোর ভয় নেই, তাদের হিমুর প্রতি অবিশ্বাস নেই। নেই তার অস্বাভাবিক জীবন নিয়ে মাথাব্যথা। আর হিমু শুধু নিঃস্ব মানুষদের গণ্ডিতেই খুঁজে পায় তার নিঃসঙ্গতার ঔষধ। খুঁজে পায় নিজের অবস্থান ও পরিবেশ।
গল্পে হিমু হিমালয় শব্দ থেকে এলেও আমার সবসময় মনে হয়েছে হিমু নামটা এসেছে সয়ং হুমায়ূন থেকেই। হিমু হুমায়ূনের বিপরীত প্রতিবিম্ব, যে জীবনে কিছুই পায়নি। আমার সবসময় মনে হয় হুমায়ূন হিমুর জীবনকে ব্যর্থতায় সাজিয়ে নিজের ব্যর্থতাকে চাপা দিতে চেষ্টা করতেন। কখনো আবার তার করা ভুলগুলো শুধরে দিতো হিমুর জীবন থেকে। এমনই এক প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তিতে জন্ম নেয় জলজ্যান্ত হিমু। কখনো মনে হয় না সে অবাস্তব। সে মূলত হাসিঠাট্টার পেছনে লুকিয়ে রাখা একরাশ আর্তনাদ।