আমাদের স্কুল-কলেজের ল্যাবের অধিকাংশ যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকে কেন?
ল্যাবে ঢুকলেই দেখা যায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ যন্ত্র নিখুঁত মান দেয় না তো ঐ যন্ত্র একেবারেই নষ্ট।
কখনো ভেবে দেখেছেন এমন হয় কেন?
কারণ আর কিছুই না। আমাদের শিক্ষার্থী বা প্রশিক্ষক কেউই খেয়াল রাখে না, একটা যন্ত্রের সহ্য ক্ষমতা কতটা। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটা যন্ত্রাংশের একটা সহনীয় ক্ষমতা থাকে।
| রোধবক্স |
রোধবক্সের কথাই ধরুন।
আমাদের ল্যাবে ১Ω-১০০০Ω পর্যন্ত মানের যে রোধবক্সগুলো থাকে সেগুলো সাধারণত ৫ ওয়াটের হয়ে থাকে। একটা রোধবক্সের প্রত্যেকটা রোধ বা এর অভ্যন্তরীণ রোধ সমান ভোল্টেজ সহ্য করতে পারে না। যত কম রোধ তা সাধারণত তত কম ভোল্টেজ সহ্য করতে পারে।
আপনি সরাসরি ১২ ভোল্টের ব্যাটারির দুই প্রান্তে লাগিয়ে দিয়েও ৩০Ω এর চেয়ে বড় যেকোনো মানের রোধ পরিক্ষা করতে পারবেন সহজেই। কিন্তু সরাসরি ব্যাটারির দুই প্রান্ত কানেক্ট করে যখন আপনি ২৮.৮Ω এর চেয়ে কম মানের রোধ তুলবেন তখনই তা গরম হতে শুরু করবে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে নষ্ট হয়ে যাবে। পরে শর্ট সার্কিট হবে, মানে রোধবক্সের ঐ রোধটা আর কাজ করবে না।
এখন তাহলে প্রশ্ন হলো, যদি কাজ করা না যায় তাহলে এই রোধগুলো কেন দেয়া হয়?
উত্তর হলো, কম ভোল্টে ব্যবহার করার জন্য। বিশেষ করে রোধবক্সগুলো সরাসরি ব্যাটারি বা এসি কারেন্টে সংযোগ দেয়ার জন্য ডিজাইন করা হয় না। এগুলো সার্কিটের মধ্যে ব্যবহার করার জন্যই ডিজাইন করা হয়।
যেমন আপনি যদি সরাসরি ১.৫ ভোল্টের ব্যাটারি ১Ω-১০০০Ω পর্যন্ত যেকোনো রোধবক্সের দুই প্রান্তে সংযোগ দেন তবু আপনার রোধগুলো নিরাপদ থাকবে। নষ্ট হবে না।
যখন রোধ তোলা হয় না, তখন বিপদ আরো বেশি। এগুলোর অভ্যন্তরীণ রোধ বড়জোড় ০.৫Ω। ১.৫ ভোল্টের একটা ব্যাটারি আপনার ০.১Ω রোধবক্সের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। মানে আপনার রোধবক্সের বিদ্যুৎ তখন ২২.৫ ওয়াট! ৫ ওয়াটের আপনার রোধবক্স গেল। এটা নিখুঁত মান দিবে ঠিক, কিন্তু কোনো রোধ না তুলে সরাসরি সংযোগ দিলে আগে পুড়ে যাবে।
অবশ্য ০.৫Ω অভ্যন্তরীণ রোধ সম্পন্ন রোধবক্স ১.৫ ভোল্ট (রোধবক্সকে সহ্য করতে হবে ৪.৫ ওয়াট) ব্যাটারি সহ্য করার ক্ষমতা রাখে। তবে তার চেয়ে বেশি ভোল্ট দিলে সেটাও শেষ। রোধবক্সকে অবশ্যই অন্য কোনো যন্ত্রাংশের (যেমন মোটর, বাল্ব, আরেকটি রোধবক্স) সাথে শ্রেণী সমবায়ে যুক্ত করতে হয়। সরাসরি ব্যাটারিতে না।
কিন্তু আমাদের পরীক্ষfর্থী বা প্রশিক্ষকদের মধ্যে সম্ভবত একটা মানসিকতা তৈরি হয়ে গেছে যে একটা ব্যাটারির বদলে কয়েকটা ব্যাটারি ব্যবহার করলে পরীক্ষার মান ভালো হবে।
কিন্তু ফল হয় ঠিক উল্টো। বেশি ভোল্ট ব্যবহার করায় নিখুঁত মানতো পাওয়া যায় না। উল্টো যন্ত্রপাতিও দ্রুত নষ্ট হয়।
আসলে ল্যাবে টেস্ট করার জন্য ১.৫ থেকে ৩ ভোল্ট উপযুক্ত। মানে একটা বা দুটো পেন্সিল ব্যাটারি সর্বোচ্চ।
আসলে ল্যাবে টেস্ট করার জন্য ১.৫ থেকে ৩ ভোল্ট উপযুক্ত। মানে একটা বা দুটো পেন্সিল ব্যাটারি সর্বোচ্চ।
এগুলো একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত (সার্কিটের কোনো বিন্দু গরম হবার আগ পর্যন্ত) বেশি বিদ্যুৎ সহ্য করতে পারে, কিন্তু তারপরই ফটাশ। যান্ত্রিক ত্রুটি।
কোন সূত্রে এই হিসাব করছি?
সূত্রটা বিজ্ঞানের প্রতিটা শিক্ষার্থীরই জানা।
P=IV
→ P=V²/R (Ohms' Law: V=IR, I=V/R)
∴ R=V²/P
এখানে,
রোধবক্সের ক্ষমতা, P=5 W
মোট ভোল্ট, V=যে সার্কিটে বসাবেন তার দু’পাশের বিভব পার্থক্য।
অভ্যন্তরীণ রোধসহ আপনার দেয়া রোধ, R=কত ওহম পর্যন্ত নষ্ট হবে না জানতে পারবেন।
মোট ভোল্ট, V=যে সার্কিটে বসাবেন তার দু’পাশের বিভব পার্থক্য।
অভ্যন্তরীণ রোধসহ আপনার দেয়া রোধ, R=কত ওহম পর্যন্ত নষ্ট হবে না জানতে পারবেন।
রোধবক্স বা সান্টবক্সের দাম কত?
২০২৬ সালের বাজার মূল্য অনুসারে,
১Ω-১০০০Ω পর্যন্ত পরিমাপযোগ্য রোধবক্স বাজার থেকে কিনতে গেলে,
সাধারণ মানের (স্কুল/কলেজের ল্যাবে ব্যবহার) ১৫০০-৩০০০ টাকা
মাঝারি মানের (বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে ব্যবহার) ৪০০০-৭০০০ টাকা
প্রোফেশনাল (অফিসিয়াল কাজের জন্য ব্যবহার) ১০০০০ টাকার ওপরে
একটা ০.১-১০০Ω সান্ট বক্স সাধারণত বাজার থেকে কিনতে গেলে
সাধারণ মানের (ল্যাবে শিখানোর জন্য ব্যবহার) ১২০০-২৫০০ টাকা
প্রোফেশনাল (অফিসিয়াল কাজের জন্য ব্যবহার) ৩০০০-৫৫০০ টাকা
আমার ইচ্ছে
আমি আমার হাইব্রিড সার্কিট ব্যবহার করে এগুলো ১০০০ টাকার নিচে বানিয়ে দেখাতে চাই। যা বর্তমানে প্রচলিত রোধবক্সের চেয়ে আরও সস্তা ও ইউজার ফ্রেন্ডলি হবে।
এখন প্রশ্ন হলো, তবে আমি এগুলো বানাচ্ছি না কেন? কারণ, আমি ৭০০-৮০০ টাকার যন্ত্র ফেলে রাখার জন্য বানাতে পারি না। যদি কলেজের ল্যাব তাদের যন্ত্রপাতি আপডেট/ঠিক করার উদ্যোগ নেয়, তবে আমি সাহায্য করতে পারি। শুরু করতে পারি এই প্রজেক্ট।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন