ফারহান সাদিক (সংগ্রাম) এর আসন্ন বই ‘বারো ভূতের আঠেরো গপ্প’‘বঙ্গভূতের সঙ্গগুণে’ নিয়ে কোনো প্রকাশনী কাজ করতে চাইলে যোগাযোগ করুন।

শতাব্দির আর্তনাদ

আমাদের শৈশবে ঘুম পাড়ানি ছড়ার অর্থ মোটেই আমাদের শৈশবের মতো আনন্দময় ছিল না। এটা কোনো ছেলে ভুলানো ছড়া হবার কথাই ছিল না, এটা অনাচারের বিরুদ্ধে এক কবির প্রতিবাদ।

সম্ভবত ছড়াটি মানুষের মনে গেঁথে গিয়েছিল বলে যুগ-যুগ ধরে মায়েরা অর্থ না বুঝেই এ গানে ঘুম পাড়িয়ে আসছে সন্তানকে। আমার মনে হয় না অর্থ জানার পর কোনো মা তার সন্তানকে এ ছড়া শুনিয়ে ঘুম পাড়াতে পারবে।

 যাই হোক, ছড়াটি ছিল এমন— 

ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গী এল দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেব কিসে?
ধান ফুরল, পান ফুরল, খাজনার উপায় কি?
আর ক’টা দিন সবুর কর, রসুন বুনেছি।
ধনিয়া-পিয়াজ গেছে পচে, সর্ষে ক্ষেতে জল
খরা-বন্যায় শেষ করিল বৎসরের ফসল।
ধানের গোলা, চালের ঝুড়ি সব শুধু খালি,
ছিন্ন কাপড় জড়িয়ে গায়ে শত শত তালি।
ধানের গাছ, বিলের মাছ যাই কিছু ছিল
নদীর টানে বাঁধটি ভেঙ্গে সবই ভেসে গেল।
এ বারেতে পাঁচ গাঁয়েতে দিয়েছি আলুর সার
আর কটা দিন সবুর করো মশাই জমিদার।

এবার ব্যাখ্যা করি—
“ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো বর্গী এল দেশে।”
বর্গী ছিল মারাঠি দস্যুদল। মগদের মত তারাও কোথাও আক্রমণ চালালে মানুষ মেরে, লুটপাট করে সারা পাড়া বিরাণ করে দিতো। সেখানে কথক জানাচ্ছে তার ছেলেও ঘুমিয়ে গেছে মানে মারা গেছে। হ্যা, এই কবিতায় ছেলে ঘুমানো মানে মারা যাওয়া বুঝানো হয়েছে।
“বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে?”
এই মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে উঠতে পাখিরা ফসল নষ্ট করে দিয়েছে। সে কিভাবে খাজনা দিবে?
“ধান ফুরল, পান ফুরল খাজনার উপায় কি?
আর ক’টা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি।”
আগের মজুদ করা ধান-পান সব ফুরিয়ে গেছে, খাজনা দেয়ার কোনো উপায় আছে তার হাতে? তিনি বলছেন- আর কয়টা দিন অপেক্ষা করুন। যে রসুন ক্ষেত করছি। তার ফলন হলেই খাজনা দিয়ে দিবো।
“ধনিয়া-পিয়াজ গেছে পচে সর্ষে ক্ষেতে জল
খরা-বন্যায় শেষ করিল বৎসরের ফসল।”
খরা আর বন্যার কবলে পড়ে পিঁয়াজ-ধনিয়া আগেই পচে গেছে। সরিষা ক্ষেতেও বন্যার পানি উঠেছে, ফলে তাও কিছুদিনের মধ্যে পচতে চলেছে।
“ধানের গোলা, চালের ঝুড়ি সব শুধু খালি
ছিন্ন কাপড় জড়িয়ে গায়ে শত শত তালি।”
ধানের গোলা, চালের ঝুড়ি সবকিছুই খালি হয়ে গেছে। যে কাপড় কথক পরে আছে, তাতেও শত শত তালি মারা।
“ধানের গাছ, বিলের মাছ যাই কিছু ছিল
নদীর টানে বাঁধটি ভেঙ্গে সবই ভেসে গেল।”
নিজের সম্পদের মধ্যে যে ধানক্ষেত আর বিলের মাছ ছিল তাও নদীর বাঁধ ভেঙে ভেসে গেছে।
“এ বারেতে পাঁচ গাঁয়েতে দিয়েছি আলুর সার
আর কটা দিন সবুর করো মশাই জমিদার।”
এবার পাঁচ গাঁয়ের লোকজন আলু চাষের উদ্যোগ নিয়েছি। আর কয়টা দিন অপেক্ষা করুন খাজনা পরিশোধ করবো জমিদার মশাই।
একজন জমিদারের তথা সরকারের নিরাপত্তাহীনতায় কথক ছেলেকে হারালো, বন্যা-খরায় ফসল নষ্ট হলো, বাঁধ ভেঙে ভেসে গেল তার সর্বস্ব, ঘরে খাবার নেই, পরার মতো ভালো জামাও নেই কিন্তু খাজনা তো মাফ নেই। তাই কথক আকুতি জানাচ্ছে এবারের মত কয়টা দিন ছাড় দিন, রসুনের ফলন হলেই সব মিটিয়ে দিবো। এরপর থেকে আমরা পাঁচ গাঁয়ের লোক আলুর চাষ করবো। ভবিষ্যতে আর আপনার খাজনা পরিশোধ করতে দেরী হবে না। এমন এক সময়ের সাধারণ মানুষের আর্তনাদকে ছড়ায় আটকে ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন আমাদের মাঝে তৎকালীন অখ্যাত এক প্রত্যক্ষদর্শী কবি। 
এই পোস্টটা দেখে মনে পরে গেল শতাব্দির সেই আর্তনাদ। মনটা খারাপ হয়ে গেল। যারা হারিয়েছে, তাদের খারাপ লাগাটা নিশ্চয়ই তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি। আমরা বলি দিন বদলেছে। কিন্তু সত্যিই কি বদলেছে? দোয়া করি, কৃষক ভাইরা কাটিয়ে উঠবে এই বিপদ। আল্লাহ ভরসা।

মন্তব্যসমূহ

FS Quote

জনপ্রিয় পোস্টগুলো