ফারহান সাদিক (সংগ্রাম) এর আসন্ন বই ‘বারো ভূতের আঠেরো গপ্প’ ‘বঙ্গভূতের সঙ্গগুণে’ নিয়ে কোনো প্রকাশন কাজ করতে চাইলে যোগাযোগ করুন।

কে এই কান্ট?

কিছু মানুষ গণতন্ত্র  নেই বলে ইরানকে অশিক্ষিত বর্বর দাবি করলে সোশ্যাল মিডিয়াতেই উঠে আসে ইরানি রাজনীতিবিদদের শিক্ষাগত যোগ্যতা। যেখানে আলী আরদাশির লারিজানি যিনি বর্তমানে ইরানের জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ এবং ইসলামিক রেভুলেশনারি গার্ডের প্রাক্তন কর্মকর্তা ছিলেন তার ২০০৪ সালে প্রকাশিত তিনটা বইয়ের প্রত্যেকটার শিরোনামেই উঠে আসে কান্টের নাম। বই তিনটি ছিল The Mathematical Method in Kant’s Philosophy, Metaphysics and the Exact Sciences in Kant’s Philosophy এবং Intuition and the Synthetic A Priori Judgments in Kant’s Philosophy

এখন প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক এই কান্টটা কে?

পুরো নাম ইমানুয়েল কান্ট। ১৮ শতকের বিরাট দার্শনিক (তাছাড়া পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের তার অবদান ছিল)। তার দর্শনে এবং তার আগের দর্শনে আকাশ-পাতাল তফাৎ। এই জার্মান দার্শনিকই আধুনিক দর্শনের ভিত্তি গড়ে দিয়ে গেছেন। জন্ম নিয়েছে আন্তর্জাতিক আইন ও তাতে মানবাধিকারের সংজ্ঞা।
(আগেই বলে রাখি তার এই তত্ত্বগুলো একটু জটিল, শুনতে অনেকটা প্যারাডক্সের মতো।)

তার বিখ্যাত কিছু দর্শন

১. নীতিবিদ্যা: তিনি নীতির একটা অসাধারণ সংজ্ঞা দেন।

সার্বজনীন তত্ত্ব: এমন কাজই করো, যা তুমি চাও পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ করুক।
বা, এমন কাজ করো, যা পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ করলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বা অবক্ষয় দেখা দিবে না।
মানে, আপনি ভাবতেই পারেন চুরি করা ঠিক। এখন যদি পৃথিবীর সব মানুষ চুরি করা শুরু করে কি হবে?
সমাজে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হবে। তাই আপনার একার জন্যও চুরি করা ঠিক না।

২. দৃষ্টিভঙ্গি তত্ত্ব: তার সবচেয়ে বেশি আলোচিত তত্ত্ব। আগের দার্শনিকরা মনে করতেন, মন হলো জগতের আয়না। তিনি বললেন না।

Noumena & Phenomena: জগতের আসল রূপ (Noumena)  আমরা কখনোই দেখতে পাই না, আমরা যা দেখি তা শুধুই ঘটনা (Phenomena)। স্থান, কাল, পারিপাশ্বিকের কারণে যা একেক জনের কাছে একেক রকম দেখায়।
মানে, দৃষ্টিভঙ্গি হলো আমাদের পরিবেশ ও পরিস্থিতি আমাদের যেভাবে দেখতে বাধ্য করে।

৩. মেধা বনাম অভিজ্ঞতা: আগের দার্শনিকদের মধ্যে দন্দ্ব ছিল। কেউ বলতেন জ্ঞান মেধার ওপর নির্ভরশীল কেউ বলতেন অভিজ্ঞতার ওপর। তিনি এসে দুই পক্ষকে মিলিয়ে দিলেন।

Reason vs. Experience: অভিজ্ঞতাহীন মেধা শূন্য আর মেধাহীন অভিজ্ঞতা অন্ধ।
অর্থাৎ, আপনার যদি অভিজ্ঞতাই না থাকে তবে আপনার মেধার কোনো দাম নেই, আর আপনার অভিজ্ঞতা আছে কিন্তু কোনো মেধা নেই, তবে আপনারই কোনো দাম নেই।

৪. ব্যক্তির সম্মান ও মর্যাদার তত্ত্বগুলো: এই তত্ত্বগুলোই মানবাধিকারের ভিত্তি।

Ends in Themselves: মানুষকে কেবল উপায় হিসেবে দেখো না, তাকে উদ্দেশ্য হিসেবে সম্মান দেখাও।
অর্থাৎ, আপনি মিথ্যে বলে কারো কাছ থেকে টাকা নিলেন, এখানে আপনি তাকে স্বার্থ হাসিলের উপায় বানালেন কিন্তু আপনার উদ্দেশ্য তাকে ধোঁকা দেয়া। কান্ট বলছে এটা অনৈতিক।
আরও সহজভাবে যদি বলি, শিক্ষককে শুধু শিক্ষাদানের উপায় হিসেবে দেখো না, এজন্য যে তাকে টাকা দিচ্ছো। বরং তাকে সম্মানও দাও।
তার এই তত্ত্ব শ্রমিক অধিকার ও দাসপ্রথা বিলুপ্তিতে বড় অবদান রেখেছে। 
স্বায়ত্বশাসন (Autonomy): স্বাধীনতা মানে যা খুশি তাই করা নয়। নিজের যুক্তি দিয়ে বানানো আইন মেনে চলাই স্বাধীনতা।
মানে আপনি অন্যের চাপে পড়ে কিছু করলে যেমন আপনি পরাধীন আপনি আবেগের বশে নিজের বিবেক বিরোধী কাজ করলেও আপনি স্বাধীন নন।
মর্যাদা বনাম মূল্য (Dignity vs. Price): যা বিনিময়যোগ্য তার মূল্য আছে, আর যা বিনিময়যোগ্য নয় তার আছে মর্যাদা।
অর্থাৎ, পণ্য বা টাকা বদলালেও কিছু যায় আসে না কিন্তু মানুষ বদলালে আগের মত পাওয়া যাবে না। মানুষ বিনিময়যোগ্য না। তাই আপনার উৎপাদিত পণ্যের আছে দাম কিন্তু শ্রমিকের আছে মর্যাদা।

জনপ্রিয় পোস্টগুলো

ফারহান সাদিক (সংগ্রাম) এর লেখা বইগুলো