ফারহান সাদিক (সংগ্রাম) এর আসন্ন বই ‘বারো ভূতের আঠেরো গপ্প’‘বঙ্গভূতের সঙ্গগুণে’ নিয়ে কোনো প্রকাশনী কাজ করতে চাইলে যোগাযোগ করুন।

বাংলা সাহিত্য ও শরীরতত্ত্ব


‘আট কুঠুরি নয় দরজা’ নামটা যেকোনো পাঠকের কাছের অতি পরিচিত। কেন হবে না, এটা সমরেশ মজুমদারের মাস্টারপিস। তবে বইটা মৌলিক হলেও নামটা মোটেও মৌলিক না। নামটা তিনি নিয়েছেন লালনের ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’ গান থেকে। গানটা ছিল-
“খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়?
ধরিতে পারলে মনবেড়ি দিতাম পাখির পায়।
আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা    মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা
তার উপরে সদর কোঠা আয়না-মহল তায়।

কপালে কি আছে জানি না    পাখিটি আমার বশ মানিল না
কোন দিন খাঁচা ছেড়ে পাখি কোন বনে পালায়।
ওরে মন তুই খাঁচার আশে    খাঁচা যে তোর তৈরি কাঁচা বাঁশে
কোন দিন খাঁচা পড়বে খসে লালন কেঁদে কয়।”
লালনের এটা একটা আধ্যাত্মিক গান। যেখানে পাখি বলতে তিনি প্রাণ বুঝিয়েছিল তা সবারই জানা। কিন্তু আট কুঠুরি আর নয় দরজাটা কি?
আসলে লালন এখানে আট কুঠুরি বলতে আমাদের শরীরের আটটা আবশ্যক অভ্যন্তরীণ অঙ্গের কথা বলেছিলেন। এগুলো হলো- মগজ (যেটাকে পরবর্তীতে তিনি সদর কোঠাও বলেছিলেন), হৃদপিন্ড, দুই ফুসফুস, পাকস্থলি, মুত্রথলি ও দুই কিডনি। এগুলোর প্রতিটিই মানুষের বেঁচে থাকতে আবশ্যক। লালন বলছে এই আট কুঠুরির মধ্যে কোথায় এই পাখি লুকিয়ে আছে জানতে পারলে মনের বেড়ি বা শিকল দিয়ে তাকে বেঁধে রাখতো।
এখন প্রশ্ন হলো- নয় দরজা কোথায়-কোথায়? চলুন গুণে দেখি। ২ চোখ, ২ কান, নাকের ২ ছিদ্র, মুখ, মল-মুত্রের ২ পথ। মোট নয়টা। এই নয় পথের যেকোনো পথে খাঁচা ছেড়ে পালাতে পারে, আত্মা নামক পাখি।

তবে আদি বাংলায় শরীরতত্ত্বের হিসেবটা একটু অন্যরকম ছিল।
বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদে দেখা যাক।
একদম প্রথম পদের কথা বলছি। যার রচয়িতা ছিলেন- লুইপা।
“কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পইঠো কাল॥”
প্রমিত বাংলা অনুবাদ করলে কথাটা এমন দাঁড়ায়।
“শরীর এক গাছ, পাঁচটা তার ডাল
চঞ্চল চিত্ত দিয়ে ঢুকে পরে কাল॥”
এখানে বোঝানো হয়েছে। শরীরে কাল/বিপদ প্রবেশের সবচেয়ে বড় মাধ্যম চঞ্চল চিত্ত বা চঞ্চল মন। তবে আমাদের আকর্ষণ অন্য জায়গায়। অনেকে মনে করেন- পাঁচটা ডাল বলতে রচয়িতা মাথা, দুই হাত আর দুই পা‘কে বুঝিয়েছেন। অনেকে আবার এই সহজ সমাধান মানতে নারাজ। তাদের মতে এই পাঁচ ডাল মূলত মানুষের পাঁচ ঈন্দ্রিয়কে বোঝাচ্ছে। এগুলো হলো- দর্শন (চোখ), শ্রবণ (কান), ঘ্রাণ (নাক), স্বাদ (মুখ) আর অনুভব (ত্বক)। এই ঈন্দ্রিয়গুলো যেমন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য, তেমন মানুষের বিপথে নেয়ার পেছনেও এই ঈন্দ্রিয়ের ভূমিকা অস্বীকার করার মতো নয়। এজন্যই বোধহয় স্বর্গের দেবতা ঈন্দ্রের থেকে ধার করা হয়েছে এই মন্ত্রমুগ্ধ করা অঙ্গের নাম।
আধুনিককালে নজরুল ‘পাপ’ কবিতায় ঈন্দ্রিয়ের প্রলোভন বিষয়ে কিন্তু দারুণ আটটি চরণ লিখেছিলেন।
“শুনিলেন সব অন্তর্যামী, হাসিয়া সবারে ক’ন,-
মলিন ধুলার সন্তান ওরা বড় দুর্বল মন,
ফুলে ফুলে সেথা ভুলের বেদনা, নয়নে-অধরে শাপ,
চন্দনে সেথা কামনার জ্বালা, চাঁদে চুম্বন-তাপ!
সেথা কামিনীর নয়নে কাজল, শ্রেনীতে চন্দ্রহার,
চরণে লাক্ষা, ঠোটে তাম্বুল, দেখে ম’রে আছে মার!
প্রহরী সেখানে চোখা চোখ নিয়ে সুন্দর শয়তান,
বুকে বুকে সেথা বাঁকা ফুল-ধনু, চোখে চোখে ফুল-বাণ।”
মানে, সৃষ্টিকর্তা বলছেন মানুষ ধুলোর সন্তান, মন খুব দুর্বল। এই পৃথিবীতে ফুলের মতো ছড়িয়ে আছে ভুলের কষ্ট, মানুষের চোখে আর ঠোঁটে আছে অভিশাপ। কিন্তু সেখানেই আবার নির্জীব চন্দনে যৌনতা আর চাঁদে চুমুর উত্তাপ লুকিয়ে আছে। সেখানে নারীর চোখে কাজল, গলায় চন্দ্রহার, পায়ে আলতা আর ঠোটে পান। তাই দেখে প্রেমের দেবতাও মরে যায়। মানে মানুষ এই তুচ্ছ জিনিসের জন্যই কষ্ট-অভিশাপ সব ভুলে যেতে পারে। চোখা চোখ নিয়ে যেখানে লাস্যময় শয়তান পাহারা দেয়। যে মানুষের বুকে রেখে দেয় ফুলের মতো দেখতে ধনুক আর চোখে ভয়ংকর তীর।
এতো বড্ড আধুনিক যুগে চলে এলাম। চর্যাপদের যুগে ফিরা যাক।

এবার একটু জটিল পদে যাই। যে পদের পুরোটাই শরীরতত্ত্বে ঠাসা। এ পদের পদকর্তা- বীরুঅপা।
“এক সে শুণ্ডিণী দুই ঘরে সান্ধঅ।
চীঅণ বাকলত বারুণী বান্ধঅ॥
সহজ থির করি বারুণী বান্ধ।
জে অজরামর হোই দিঢ় কান্ধ॥
দশমি দুআরত চিহ্ন দেখআ।
আইল গরাহক আপণে বহিআ॥
চউশঠী ঘড়িয়ে দেত পসারা।
পইঠেল গরাহক নাহি নিসারা॥
এক ঘড়ুলী সরুই নাল।
ভণন্তি বিরুআ থির করি চাল
বাংলায় কিছুটা এমন দাঁড়ায়,
“একজন মদওয়ালী থাকে দুই ঘরে
চিকন বাকলে সে রাখে মদ ধরে।
সহজ করে এ মদ, সতেজ করে মন,
মরার থেকে বাঁচায়, দেয় যৌবন।
দশম দরজায় ছিল চিহ্ন আঁকা,
ক্রেতা এলো চিনে তাই দেখে একা।
চৌষট্টি ঘটি মদ দিয়ে দিলো দোকান
ক্রেতা তাতেই বন্দি করলো তার প্রাণ।
সেখানে ঘড়ায় মদ ভরে সরু নাল
মনোযোগে মদ ঢালে স্থির করে চাল।”
এক নারী শুঁড়ি/মদ বিক্রেতা/বারটেন্ডার (প্রাণকে বোঝানো হয়েছে) দুই ঘরে যাতায়াত করে। এতকাল পরে কারো মতে এটা নাকের দুই ছিদ্র, কারো মতে দুই ফুসফুস, কেউ শিরা-ধমনী কেউবা আবার এটাকে দুই প্রধান স্নায়ুতন্ত্রের অংশের (সিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র ও প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র) সাথে তুলনা করে। এই শুঁড়ি এখানে বসে মদ (ডোপামিন বলতে পারেন) তৈরি করে। যা মানুষকে স্বাভাবিক রাখে, রাখে রোগমুক্ত। মানুষের শরীরে সাধারণত ৯টি দরজা থাকে যা আগেই বলেছি, কিন্তু এখানে পদকর্তা বলেছে দশম দরজার কথা। কিন্তু মানুষের জন্মের আগে আরেকটা ছিদ্র থাকে যা সময়ের সাথে সাথে ভরাট হয়ে যায়। মানুষের নাভি। পদকর্তা বলছে জন্মের শুরুতে দশম দরজার চিহ্ন দেখে ক্রেতা (ব্যক্তি) নিজেই চলে আসে। চৌষট্টিটি পাত্র (চৌষট্টিটি নাড়ির বা স্নায়ুর সংযোগস্থল) দিয়ে দোকান দিয়েছে এই মদ বিক্রেতা, যেই মাদকের আড্ডায় ক্রেতা একবার ঢুকলে আর বের হতে পারে না। একটা সরু নালির ভেতরেই থাকতে হয় তাকে। সম্ভবত স্নায়ুরজ্জুকে বোঝানো হয়েছে এখানে।
সবশেষে সবচেয়ে জনপ্রিয় চরণ-
“পঞ্চাঙ্গ দিআ পহিছিনু কাল॥”
পাঁচ অঙ্গ দিয়ে যেখানে বিপদ প্রবেশ করে। এই পাঁচ অঙ্গ দিয়ে পদকর্তা প্রধান পাঁচ অঙ্গ বুঝিয়েছে নাকি পাঁচ ঈন্দ্রিয় নাকি জ্যোতিষশাস্ত্রের পাঁচ অঙ্গ (তিথি, বার, নক্ষত্র, যোগ ও করণ। যেখানে কাল মানে বিপদ না, সময়) তা পদকর্তাই ভালো জানে। আমি আর সে বিতর্কে যাবো না।
আদি সাহিত্যে ৫টা দরজা (বীরুঅপা অবশ্য ১০ দরজার কথাও বলেছেন) থাকলেও, আধুনিককালে কিন্তু ৯টা দরজাই সবচেয়ে জনপ্রিয়। তবে কেউ কেউ দু’মতের পক্ষেই আছে।
তাদের মত সহজে ও আধুনিক ভাষায় মানে কম্পিউটারের ভাষায় বললে, আদি সাহিত্যের ৫টা মূলত শরীরের ইনপুট অংশ। কিন্তু আধুনিক বাংলার ৯ দরজা বা বীরুঅপার উল্লেখিত দশ দরজা মূলত ইনপুট-আউটপুট দুটোরই অংশ। তবে কে জানে কোনটা আত্মার গোপন পথ। যুগ যুগ ধরে আত্মাকে ও আত্মকে খোঁজার চেষ্টাতো আর মানুষ কম করেনি

মন্তব্যসমূহ

FS Quote

জনপ্রিয় পোস্টগুলো