ফারহান সাদিক (সংগ্রাম) এর আসন্ন বই ‘বারো ভূতের আঠেরো গপ্প’‘বঙ্গভূতের সঙ্গগুণে’ নিয়ে কোনো প্রকাশনী কাজ করতে চাইলে যোগাযোগ করুন।

অবিভক্ত বাংলা গঠন কিংবা বাংলার সেভেন সিস্টার দখল প্রসঙ্গে

আমার মনে হয় না আমি কখনো সেভেন সিস্টার বা অবিভক্ত বাংলা নিয়ে কোনো কথা বলেছি। অবিভক্ত বাংলা টপিকে যতবার মানুষ কথা বলতে বলেছে আমি ততবারই বলেছি যা ভেঙে গেছে দীর্ঘ সময় পর তা আর জোর করলেই জোড়া লাগে না।
ভারতীয় মাধ্যমে ভারতীয় কিছু নেতা বা এদেশীয় কিছু প্রাণী যারা নিজের বাপের জায়গা চাচার থেকে উদ্ধার করতে পারে না তারা প্রায়ই প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে ফুটেজ খায় অবিভক্ত বাংলা বা সেভেন সিস্টার নিয়ে কথা বলে। যারা বঙ্গভঙ্গের বিরোধী ছিলেন বলে রবীন্দ্রনাথকে উপহাস করে তারাই আবার অবিভক্ত বাংলার কথা বলে, এটা কোন লেভেলের স্যাটায়ার আমার জানা নেই। বাস্তবে এটা কখনোই সম্ভব না। শুধু ভারতের কারণে না, বাংলাদেশের কারণেও।
কিছু অতি উৎসাহী ব্লগারের মতো ভারত অনেক বড় দেশ, বিশাল বাহিনী আর পারমানবিক শক্তি এমন সব কথা বলতে যাচ্ছি না। তাদের যেমন বিশাল বাহিনী আছে বিশাল বর্ডার জুড়ে সারাদিন-রাত কুস্তিও করতে হয় আর পারমাণবিক বোমা শোপিস। তারাও জানে জাতিসংঘ না ভাঙলে কোনোদিনই এটা ব্যবহার করতে পারবে না।
আমি আজ বলবো বাংলাদেশের জন্য কেন তা সম্ভব নয়। সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু বাদ দিলাম। সংস্কৃতিতেও দু’পাশের পার্থক্য ৭৯ বছরের। এখন দুটো এক বোতলে নিয়ে ঝাঁকি দিলেই এক হয়ে যাবে এমন না ব্যাপারটা।

অবিভক্ত বাংলার স্বপ্নের দোষে আসি। এই স্বপ্ন কতটা ভঙ্গুর সে ব্যাপারে বলছি।
অর্থনীতির ব্যাপারে যদি বলি- ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি ছিল ৪৭৫ বিলিয়ন ডলার, ঠিক তার পাশের পশ্চিমবঙ্গের জিডিপি ২১৩ বিলিয়ন ডলার। মানে দুই পাশের অর্থনীতিতে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। একটা অঙ্গরাজ্যকে নিয়ে নেয়ার মানে তাকে ভোগ দখল করা না, তাকে সমান সুযোগ-সুবিধা দেয়া, সমান অধিকার নিশ্চিত করা। এখন দুটোকে এক বোতলে ভরতে চাইলে, আপনাকে অবিভক্ত বাংলার সিংহভাগ টাকা ঢালতে হবে পশ্চিমবঙ্গের পেছনে। এতে আবার পাকিস্তান আমলের মতো চার্ট তৈরি হবে পশ্চিম বাংলায় সরকার কত খরচ করছে আর পূর্ব বাংলায় কত। ফলাফল হবে পূর্ব বাংলার (মানে বাংলাদেশের) অসন্তোষ, আর অবিভক্ত বাংলা আবার ভেঙে যাবে।
সংস্কৃতির প্রশ্নে যদি বলি- বাংলা একসময় হিন্দু-মুসলিম সবার থাকলেও দু’পাশে এখন আলাদা সংস্কৃতি। দুটোকে এক জায়গায় নিয়ে এলে সংস্কৃতি উন্নত হবার বদলে সাংস্কৃতিক দাঙ্গাই বেশি হবে। তারপর আবার সাংস্কৃতিক ইস্যুতে আওয়াজ উঠবে অবিভক্ত হিন্দুস্তানের।
তাছাড়া দু’পাশের আইন-কানুনেও বিস্তর ফারাক। যেমন, ওপাশে মদ সহজলভ্য হলেও এপাশে আইন একটু কড়া। যা পাওয়া যায় তাও মূলত ওপাশ থেকেই বেআইনি উপায়ে আসা।

এবার সেভেন সিস্টার ইস্যুতে বলি।
ভারতের শক্ত একটা অর্থনীতি আছে তবে তা মুষ্টিমেয় কিছু অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ। বিশেষ করে মহারাষ্ট্র, তামিলনাডু, উত্তরপ্রদেশ এগুলোর অর্থনীতি পুষ্ট। সে তুলনায় সেভেন সিস্টার মানে আসাম (৬৮ বিলিয়ন ডলার), ত্রিপুরা (৮ বিলিয়ন ডলার), অরুনাচল (৫ বিলিয়ন ডলার), মেঘালয় (৭ বিলিয়ন ডলার), মণিপুর (৫ বিলিয়ন ডলার), মিজোরাম (৩ বিলিয়ন ডলার) আর নাগাল্যান্ড (৫ বিলিয়ন ডলার) হতদরিদ্র। একই অর্থবছরে ২৫৫,০৮৩ বর্গ কিলোমিটারের এই সাত বোনের মোট জিডিপি ছিল মাত্র ১০১ বিলিয়ন ডলার। যা ৮৮,৭৫২ বর্গ কিলোমিটারের পুরো পশ্চিমবঙ্গের অর্ধেকের ও বাংলাদেশের জিডিপির চারভাগের এক ভাগেরও কম।
যেখানে পশ্চিমবঙ্গের সাথে এক হওয়াই অসম্ভব সেখানে এই সাত রাজ্যের সংস্কৃতি-অর্থনীতি কোনোক্ষেত্রেই মিল না থাকা সত্যেও কিভাবে এক হতে পারবে বলে আশা করে কিছু বিশ্লেষক আমার বুঝে আসে না। হ্যা, একসময় সেভেন সিস্টার খনিজে হেভেন ছিল হয়তো, অনেকের হয়তো পৈত্রিক আদিনিবাসও ছিল। কিন্তু সেই অবিভক্ত বঙ্গের স্বপ্ন বঙ্গভঙ্গ রদের সাথে সাথেই চিতায়ও উঠে গেছিলো। কিছু জিনিস চাইলেই জোড়া লাগানো যায় না। তার মধ্যে একটি হলো দেশ।

মন্তব্যসমূহ

FS Quote

জনপ্রিয় পোস্টগুলো