কখন একটা লেখা কবিতা হয়ে উঠে?
কবিতা (Poem), যাকে বলা হয় সাহিত্যের মুকুট। বাংলাতো সেই কবিতার দেশ। এখানের মাটির মতো ভাষাও দারুণ উর্বর। এখানে মানুষের সাহিত্যচর্চা শুরুই হয় নতুন কোনো ছন্দ বুনে বা মনে মনে নতুন কোনো গানের সুর তুলে। খুব সহজেই এক শব্দের সাথে আরেক শব্দের মিল দিয়ে গেঁথে ফেলা যায়, কাব্য নামক নকশিকাঁথা।
যদিও বর্তমানে সাহিত্যে কবিতার নামে যা চলে তার বেশিরভাগই কবিতা না। যার কারণে বেশিরভাগ পাঠকই কবিতা পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। উইকিপিডিয়াতেও দেখলাম কোনটা কোন ছন্দ, তাদের বৈশিষ্ট্য কি স্পষ্ট করে লেখা নেই। একটার সাথে আরেকটা গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। না থাকুক, আমি বিষয়টা সহজ করার চেষ্টা করছি। আশা করি যারা কবিতা লেখতে চান, তাদের কাছে বিষয়টা সহজ হবে।
কবিতা প্রধানত অন্ত্যমিলের ভিত্তিতে ২ ধরনের। মিত্রাক্ষর ও অমিত্রাক্ষর।
কবিতা প্রধানত অন্ত্যমিলের ভিত্তিতে ২ ধরনের। মিত্রাক্ষর ও অমিত্রাক্ষর।
- মিত্রাক্ষর
যেসব কবিতার অন্ত্যমিলগুলো (লাইনের শেষের মিলগুলো) জোড়ায় জোড়ায় থাকে তারা মিত্রাক্ষর। আরো নিখুঁতভাবে বললে একটা নিয়মে অন্ত্যমিলগুলো সাজানো থাকে। আর এর ছন্দ মিত্রাক্ষর ছন্দ।যেমন: রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার কথা চিন্তা করুন।
শুধু বিঘে-দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে।
বাবু বলিলেন, ‘বুঝেছ উপেন? এ জমি লইব কিনে।’
কহিলাম আমি, ‘তুমি ভূস্বামী, ভূমির অন্ত নাই –
চেয়ে দেখো মোর আছে বড়জোর মরিবার মতো ঠাঁই।
শুনি রাজা কহে, ‘বাপু, জানো তো হে, করেছি বাগানখানা,
পেলে দুই বিঘে প্রস্থে ও দিঘে সমান হইবে টানা –
ওটা দিতে হবে।’ কহিলাম তবে বক্ষে জুড়িয়া পাণি
সজল চক্ষে, ‘করুন রক্ষে গরিবের ভিটেখানি।
লাইনের শেষ অক্ষরগুলো দেখুন ণে-নে-ই-ই-না-না-ণি-নি। অন্ত্যমিলগুলো জোড়ায় জোড়ায় আছে। এই চরণ বিন্যাসকে সাজিয়ে লেখা হয় এভাবে, ‘ককখখ-গগঘঘ’।{নে=ক, ই=খ, না=গ, নি=ঘ}
সবসময় ছন্দ এত সরল হবে, বা হতে হবে এমন কিন্তু না।
‘কখ-কখ’ হতে পারে আবার ‘কখগ-কখগ’ ধরনের মিত্রাক্ষর হতে পারে আবার ‘কখকখগ-কখকখগ’ এর মতো ভারিক্কি ছন্দও হতে পারে মিত্রাক্ষরে।
তিন প্রকার মিত্রাক্ষর ছন্দ বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়।
১. মাত্রাবৃত্ত: মাত্রাবৃত্ত হলো মাত্রা নির্ভর ছন্দ। আগে জানাই দল, রুদ্ধদল ও মুক্তদল কী। একটা শব্দ উচ্চারণ করতে আমরা শব্দকে যতগুলো আলাদা আলাদা খন্ড করছি, তার প্রত্যেকটা একেকটা দল বা সিলেবল। আরো সহজ করে বললে ঐটাই সিলেবল বা দল যেটা পুরো শব্দের সাথে পড়লে ও শুধু ঐ শব্দাংশটা পড়লে একই শোনায়।
যেমন: ‘তোর’ এর ‘তো’ কে আলাদা করে উচ্চারণ করতে পারলেন কিন্তু ‘র’ এর আলাদা করে উচ্চারণ করলে একই উচ্চারণ পাবেন না, তাই ‘তোর’ পুরোটাই একটা ইউনিট বা দল। নিচের কবিতা ‘দির’, ‘বর’, ‘ছের’, ‘ছর’, ‘এর’ দলগুলোর ‘র’ এর উচ্চারণও আর এক থাকে না। তাছাড়া ‘লিম’ এর ‘ম’, ‘রিশ’ এর ‘শ’, ‘নয়’ এর ‘য়’ [‘য়’ তো কখনো একা উচ্চারণই করা যায় না তাই একে ‘অন্তঃস্থ অ’ বলে] ‘অন’ এর ‘ন’ শব্দগুলোর উচ্চারণও বদলে যায়।
যে দলের শেষে স্বরধ্বনি উচ্চারণ হয় তা মুক্তদল আর শেষে ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণ হলে বদ্ধদল। মুক্তদলের মাত্রা ১ আর রুদ্ধদলের মাত্রা ২।
উদাহরণ:
‘কক’ ছন্দ দেখা যাচ্ছে এখানে। লাইন প্রতি দলগুলো চলুন গুনে দেখি।উদাহরণ:
এইখানে তোর দাদির কবর , ডালিম-গাছের তলে
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।
‘তোর’, ‘দির’, ‘বর’, ‘লিম’, ‘ছের’, ‘রিশ’, ‘ছর’, ‘অন’ দলগুলোর শেষে ব্যঞ্জনধ্বনি আছে, এগুলো ২ মাত্রার। সরাসরি স্বরবর্ণ ও ‘কার’ যুক্ত দল ছাড়াও ‘ত’ (ত+অ), ‘ব’ (ব+অ) ‘নয়’ (ন+এ) ও ‘জ’ (জ+অ) এর লিখিতরূপে না থাকলেও উচ্চারণে স্বরধ্বনি ছিল তাই এগুলোও মুক্তদল। মুক্তদল সব ১ মাত্রা।
শব্দগুলোর জায়গায় সংখ্যা বসানো যাক।
তাহলে চলুন এবার মাত্রা গণনা করি। ৬+৬+৬+২। হ্যা, এটাই জসীমউদ্দীনের কবর কবিতার মাত্রা বিন্যাস।
২. স্বরবৃত্ত: স্বরবৃত্ত ও দল নির্ভর ছন্দ। তবে এতে রুদ্ধদল-মুক্তদল আলাদা কিছু না। দুটোর মানই এক। এটা দ্রুত পড়ার উপযোগী, আর এটাই স্বরবৃত্তের কবিতাগুলো পড়ার ও শোনার সময় দারুণ অনুভূতি দেয়।
মনে করুন নজরুলের কাণ্ডারী হুশিয়ার কবিতার প্রথম দুটো লাইন,
দুর্গম গিরি/ কান্তার মরু/ দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে/ রাত্রি নিশিথে/ যাত্রীরা হুশিয়ার।
এবার প্রতি জোড়ার আপনার উচ্চারণ খেয়াল করুন। এমনভাবে ভেঙে ভেঙে উচ্চারণ করছেন না?
অনেকে ‘নি+শিথে’ না পড়ে ‘নিশি+থে’ ও পড়ে থাকতে পারেন।
এবার তাহলে চলুন গুণে দেখি লাইনগুলো কয়টি দলে ছন্দিত হচ্ছে।
আমি পেলাম এই স্তবক বা শ্লোকের প্রতি লাইনে ৪+৪+৫টি দল।
৩. অক্ষরবৃত্ত: এতদিন ছন্দ ছিল মৌখিক, কিন্তু আধুনিক বাংলায় এসে ছন্দগুলো হয়ে গেল লৈখিক বা অক্ষর নির্ভর। দল/সিলেবলের ঝামেলা এড়াতে আবির্ভাব হয় অক্ষরবৃত্তের। অক্ষর সংখ্যাই এখানে আসল। ঐটা একটা একক বর্ণ বা যুক্তবর্ণ বা পরাশ্রয়ী বর্ণযুক্ত (ং, ঃ, ঁ) বর্ণ হোক, কিন্তু অক্ষরবৃত্তের হিসেবে সে একটা মাত্র অক্ষর। একটা একক/ইউনিট।
আমার এই অণুকাব্যটি দেখুন,
চলুন, এই অক্ষরবৃত্তের প্রতি লাইনে অক্ষর গুনে দেখি। শব্দের সেটগুলো দেখুন ২+৫+৬ অক্ষর। এটা অক্ষরবৃত্ত।
বিঃদ্রঃ পরাশ্রয়ী বর্ণগুলোর মধ্যে ‘ৎ’ যেহেতু ‘ত্’ এর সংক্ষিপ্তরূপ তাই কোনো শব্দের শেষে বসলে সে নিজেই একটা অক্ষর (ত) আর শব্দের মাঝে বসলে সে পরের বর্ণ নিয়ে এক অক্ষর। যেমন ধরুন- ‘হঠাৎ’ ৩ অক্ষরের কিন্তু ‘চমৎকার’ ৪ অক্ষরের। এখানে ‘চমৎকার’-এ ‘ত্+ক’ মিলে একটাই যুক্তবর্ণ অন্যদিকে ‘হঠাৎ’, ‘ভবিষ্যৎ’ বা ‘বিদ্যুৎ’- এ সে আস্ত একটা ‘ত’।
বিঃদ্রঃ পরাশ্রয়ী বর্ণগুলোর মধ্যে ‘ৎ’ যেহেতু ‘ত্’ এর সংক্ষিপ্তরূপ তাই কোনো শব্দের শেষে বসলে সে নিজেই একটা অক্ষর (ত) আর শব্দের মাঝে বসলে সে পরের বর্ণ নিয়ে এক অক্ষর। যেমন ধরুন- ‘হঠাৎ’ ৩ অক্ষরের কিন্তু ‘চমৎকার’ ৪ অক্ষরের। এখানে ‘চমৎকার’-এ ‘ত্+ক’ মিলে একটাই যুক্তবর্ণ অন্যদিকে ‘হঠাৎ’, ‘ভবিষ্যৎ’ বা ‘বিদ্যুৎ’- এ সে আস্ত একটা ‘ত’।
অক্ষরবৃত্তকে বলা হয় আধুনিক বাংলা ছন্দ। অমিত্রাক্ষরের মতো অক্ষরবৃত্তের জনপ্রিয়তার পেছনেও বড় অবদান আছে মাইকেল বাবুর।
- অমিত্রাক্ষর
যেসব কবিতার অন্ত্যমিলের তত কড়াকড়ি নিয়ম মানে না তারা সামগ্রিকভাবে অমিত্রাক্ষর।অমিত্রাক্ষরেও অনেক ধরন দেখা যায়। যেমন:
- মধুসূদনের অমিত্রাক্ষর: ৮+৬ মাত্রার অক্ষরবৃত্তের অনুকরণে তিনি নিজেই অমিত্রাক্ষর ছন্দ বানিয়েছিলেন। যেখানে লাইন প্রতি অক্ষর সংখ্যা সমান হলেও অন্ত্যমিল জোড়ায় সবসময় থাকতো না। কবিতা লেখা হতো পয়ার বা মহাপয়ারে। এটাই আসলে অমিত্রাক্ষর নামে পরিচিত। কারণ তিনিই প্রথম বাংলা কবিতায় অমিত্রাক্ষরের প্রচলন শুরু করেন। তিনি তার মহাকাব্য পুরোটা লিখেছিলেন এই ছন্দে।
(পয়ার কী তা সবার শেষে বলেছি)
সম্মুখ সমরে পড়ি, বীর-চূড়ামণি
বীরবাহু, চলি যবে গেলা যমপুরে
অকালে, কহ, হে দেবি অমৃতভাষিণি,
কোন্ বীরবরে বরি সেনাপতি-পদে,
পাঠাইলা রণে পুনঃ রক্ষঃকুলনিধি
রাঘবারি? কি কৌশলে, রাক্ষসভরসা
ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদে — অজেয় জগতে —
ঊর্মিলাবিলাসী নাশি, ইন্দ্রে নিঃশঙ্কিলা?
অক্ষরবৃত্তের মতো লাইনে ৮+৬=১৪টি অক্ষর প্রতি লাইনে রিপিট হচ্ছে কিন্তু মাত্র দুটি ‘ণি’ ছাড়া আর কোনো লাইনে কোন অন্ত্যমিল নেই। এটাই মাইকেল মধুসূদন দত্তের নিজের স্টাইলের অমিত্রাক্ষর। যেটা পরবর্তীতে অনেক বাঙালি কবি ব্যবহার করেছিল। তিনি অবশ্য এখানে ‘ ি’, ‘ ে’ আর ‘া’ দিয়ে ছন্দ সাজিয়েছিলেন। তবু এটা গতানুগতিক অক্ষরবৃত্তের মতো ছিল না, কারণ ‘কার’ চিহ্ন মিললেই উচ্চারণে মিলে না।
- মুক্তছন্দ: জীবনানন্দ দাশের কবিতাগুলোতে কোথাও কোথাও তিনি ছন্দ রেখেছেন আবার কোথাও কোথাও কোনো ছন্দের অস্তিত্বই নেই। এই ছন্দ প্রতিষ্ঠা করতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে জীবনানন্দকে। প্রকাশকরা প্রথমদিকে কবিতার নামে তার লেখা ছাপাতেই চায়নি। কারণ তাতে না ছিল অক্ষরের কোনো লাগাম আর না ছিল জোড়ায় জোড়ায় অন্তমিল।
তুমি তো জান না কিছু, না জানিলে -
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে !
যখন ঝরিয়া যাব হেমন্তের ঝড়ে ,
পথের পাতার মতো তুমিও তখন
আমার বুকের ’পরে শুয়ে রবে ?
অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন
সেদিন তোমার !
তোমার এ জীবনের ধার
ক্ষয়ে যাবে সেদিন সকল?
আমার বুকের ‘পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল,
তুমিও কি চেয়েছিলে শুধু তাই!
২য় আর ৩য় লাইনে অন্ত্যমিল আছে, ৪র্থ আর ৬ষ্ঠ লাইনেও আছে, ৭ম আর ৮ম লাইনেও মিল, মিল ৯ম আর ১০ম লাইনেও আছে। কিন্তু ১ম, ৫ম আর ৮ম লাইনে কোনো অন্ত্যমিল নেই। এ ধরনের একটা নিজস্ব মুক্তছন্দ তৈরি করেছিলেন জীবনানন্দ। এই মনে হয় ছন্দ আছে আবার এই মনে হয় ছন্দ নেই। দুঃখের কবিতার ক্ষেত্রে পাঠকরা যেন ধাক্কা খায় তাই পরবর্তীতে অন্যান্য লেখকরাও এই ফ্রি-স্টাইলে কবিতা লিখেছেন। এগুলোকে চাইলেই ক-খ-গ ফ্রেমে বেঁধে ফেলতে পারবেন না। - ছড়াছন্দ: ছড়াছন্দে প্রতি লাইনের মিল গুরুত্বপূর্ণ না। প্রতি দুই লাইন পরপর অন্তমিল মিললেই সুপাঠ্য হয়ে যায়। লাইনগুলো মোটামুটি সমান রাখলেই হয়ে যায়।
হয়তো তোমাকে হারিয়ে দিয়েছি
নয়তো গিয়েছি হেরে,
থাক না ধ্রুপদী অস্পষ্টতা
কে কাকে গেলাম ছেড়ে।
এখানে ‘হেরে’ আর ‘ছেড়ে’ অন্তমিল থাকলেও ‘দিয়েছি’ আর ‘অস্পষ্টতা’ শব্দগুলোতে মিল নেই। এগুলোতে মিল না থাকলেও পড়ার গতি নষ্ট হয় না বলে এগুলো ছড়াছন্দ।কখনো কখনো আবার ছড়াছন্দে লাইনের ভেতরে মিল পাওয়া যায়, যা হুবুহু মিত্রাক্ষরের মতো।
উদাহরণ: সুকুমার রায়ের ‘হুঁকোমুখো হ্যাংলা’ কবিতাটা দেখুন।
হুঁকোমুখো হ্যাংলা বাড়ি তার বাংলা
মুখে তার হাসি নাই দেখেছ?
নাই তার মানে কি? কেউ তাহা জানে কি?
কেউ কভু তার কাছে থেকেছ?
‘হ্যাংলা’ -‘বাংলা’, ‘মানে কি’-‘জানে কি’, ‘দেখেছ’-‘থেকেছ’ তে মিল রয়েছে।মিত্রাক্ষরের মতো ছন্দ সাজালে এমন পাবো কিছুটা- ‘কক-খ-গগ-খ’। এটা মিত্রাক্ষর আর অমিত্রাক্ষরের মাঝামাঝি একটা ছড়াছন্দ।
বিঃদ্রঃ ইদানিং গদ্য কবিতা বা গদ্য ছন্দ বলে যেই টার্মটা প্রচলিত হয়েছে, তা মূলত গদ্যেরই বিশেষ রূপ। তা পুরোপুরি কবিতা নয়। অবশ্য গদ্য সাহিত্যের এটা একটা সুন্দর ধরণ। কবিতার অনুকরণে অল্প লেখার মাধ্যমেই মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য এটা তৈরি। অনেকে এটাকে যদিও অমিত্রাক্ষরের একটা প্রকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে, কিন্তু কবিতা যে প্রকারেরই হোক না কেন, তার মধ্যে একটা সংখ্যার খেলা থাকে যা ‘গদ্য কবিতা’-র ক্ষেত্রে থাকে না, তাই এটাকে সরাসরি কবিতা বলা যায় না।
এই শাখায় মহাদেব সাহা অনেক লেখালেখি করেছেন। তবে আমার কাছে এই জনরার সবচেয়ে প্রিয় লেখা জহির রায়হানের ‘আর কতদিন’। যদিও তিনি কোনোদিন এটাকে কবিতা দাবী করেননি। কিন্তু এই বইটাকে একই জনরায় ফেলা যায়।
পয়ারধর্মী কবিতা
লাইনের অক্ষরের ভিত্তিতে সাজানো হয় পয়ারধর্মী কবিতা। পয়ার বাংলা কবিতার ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য। অন্যান্য ভাষায় এটা দেখা গেলে তা নিছক কাকতালীয় ঘটনা। অক্ষরবৃত্ত আর মাইকেলের অমিত্রাক্ষর ছন্দের মূল ভিত্তি এই পয়ার।
- লঘুপয়ার: কবিতার প্রতিলাইনে ২ ভাগে ৮টা (৪+৪) বা ১০টা (৬+৪) অক্ষর থাকে।
- পয়ার: কবিতার প্রতিলাইনে ২ ভাগে ১৪টি (৮+৬) অক্ষর থাকে।
- মহাপয়ার: কবিতার প্রতিলাইনে ২ ভাগে ১৮টি (১০+৮) অক্ষর থাকে।
- ত্রিপদী পয়ার: কবিতার প্রতিলাইনে ৩ ভাগে ২০টি (৮+৬+৬) অক্ষর থাকে।
- মালঝাঁপ পয়ার: কবিতার প্রতিলাইনে সাধারণত ২৪টি (৮+৮+৮) অক্ষর থাকে এবং লাইনের খণ্ডগুলোতে অভ্যন্তরীণ মিল থাকে।
- লঘুচৌপদী/চম্পকমালা পয়ার: কবিতার প্রতিলাইনে ৪ ভাগে ২০টি (৬+৬+৪+৪) অক্ষর থাকে।
- চৌপদী পয়ার: কবিতার প্রতিলাইনে ৪ ভাগে ২৪টি (৬+৬+৬+৬) অক্ষর থাকে।
- তূণক পয়ার: কবিতার প্রতিলাইনে সাধারণত ৪ ভাগে ২৪টি (৬+৬+৬+৬) অক্ষর থাকে এবং লাইনের খণ্ডগুলোতে অভ্যন্তরীণ মিল থাকে, যা একে তীরের মতো দ্রুত ও ধারালো করে তোলে।
- মিশ্র পয়ার: কবিতায় পয়ার আর মহাপয়ার দুই ধরনের চরণই একসাথে একই কবিতায় থাকলে তা মিশ্র পয়ার।
মালঝাঁপ পয়ার ও তূণক পয়ারের কাঠামোতে অক্ষর সংখ্যা কম বেশিও হতে পারে, তবে তাদের অভ্যন্তরীণ মিল সবসময় থাকে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন