বাংলাদেশের সেনা অভ্যুত্থানের তালিকা
আমাদের বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় পাতায় রক্ত। সেনা বাহিনী বানানো হয়েছিল দেশকে নিরাপত্তা দিতে কিন্তু বাংলাদেশের শিকড়ে রাজনীতি এমনভাবে ছড়িয়ে পরেছে যে সেনারাও কখনো একদল একমত হতে পারেনি। চিন্তা করে দেখুন ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের কথাই। একদল সেনা ছাত্রদের গুলি চালিয়েছে, আরেকদল শেখ হাসিনাকে পালাতে সাহায্য করেছে আরেকদল ভেঙেছে বঙ্গবন্ধুর মূর্তি। যে দল জিততে চলে সে গ্রুপ তখন সক্রিয় হয়; এটা শুধু সেনা না সাংবাদিক, নাগরিক সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি হয় যখন জয়-পরাজয় অনিশ্চিত হয়ে পরে, তখন দু’পক্ষই সমানে সমান হয়ে মাঠে নেমে পড়ে। কাল যদি বাংলাদেশে কোনো দেশ অগ্রাসন চালায় একদল অগ্রাসীদের পক্ষেও চলে যাবে, তাদের মত হবে এক দুর্নীতি, অনিয়ম, ভেজালে জর্জরিত দেশ পরিশোধনের জন্য এটা প্রয়োজন ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে হয়ে গেছে ছোট-বড় ৩০টি সফল ও ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টা। তার মধ্যে পাঁচটা বড় অভ্যুত্থান সরাসরি বাংলাদেশের চিত্রই বদলে দিয়েছিল। মুজিব থেকে এরশাদ এই টাল-মাটাল সময়টাতেই একের পর এক হয়েছিল সবগুলোই অভ্যুত্থান। তালিকাটা দেখুন-
- ১৫ আগস্ট ১৯৭৫: সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপরিবারে হত্যা। নেতৃত্বে ছিল ডালিম, ফারুক ও রশিদরা।
- ৩ নভেম্বর ১৯৭৫: ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের পদ কেড়ে নিয়ে তাকে গৃহবন্দি করে।
- ৭ নভেম্বর ১৯৭৫: জাসদের সমর্থনে সিপাহি-জনতার যৌথ অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা ফিরে পাওয়া ও মোশাররফকে অপসারণ।
- ১৬ এপ্রিল ১৯৭৬: কর্ণেল জিয়াউদ্দিনের সমর্থক সৈন্যদের বগুড়া সেনানিবাসের বিদ্রোহ।
- ৩০ জুলাই ১৯৭৬: বিমানসেনাদের ব্যর্থ হওয়া বিদ্রোহ।
- ১৯ অক্টোবর ১৯৭৬: ঢাকা ও বগুড়ায় আলাদা আদালা অভ্যুত্থানচেষ্টা।
- ১১ জুলাই ১৯৭৭: কুমিল্লা সেনানিবাসের বিদ্রোহ।
- ২৮ জুলাই ১৯৭৭: রংপুর সেনানিবাসের সামরিক সংঘাত।
- ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭: বগুড়া সেনানিবানের ২২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের স্বশস্ত্র বিদ্রোহ।
- ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭: ঢাকা সেনানিবাস ও তেজগাঁও বিমানবন্দরে বিমানবাহিনীর বিদ্রোহ চেষ্টা।
- ২ অক্টোবর ১৯৭৭: ঢাকা বিমানবন্দরে বিমানবাহিনীর রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হত্যা।
- ১৫ অক্টোবর ১৯৭৭: যশোর সেনানিবাসে অভ্যুত্থানচেষ্টা।
- ২৫ নভেম্বর ১৯৭৭: চট্টগ্রাম সেনানিবাসে বিশৃঙ্খল অবস্থার বিরুদ্ধে সিপাহি আন্দোলন।
- ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭৭: রাজশাহী ঘাটিতে সেনাদের ব্যর্থ বিদ্রোহ।
- ৯ মার্চ ১৯৭৮: জিয়া বিরোধী সেনাদের চক্রান্ত ফাঁস ও অনেকে গ্রেপ্তার।
- ১৮ মে ১৯৭৮: বগুড়ায় পুনরায় অভ্যুত্থানচেষ্টা।
- ৬ নভেম্বর ১৯৭৮: নৌবাহিনীর একাংশের অভ্যুত্থানচেষ্টা।
- ১৮ জানুয়ারি ১৯৭৯: কুমিল্লায় পুনরায় অভ্যুত্থানচেষ্টা।
- ২১ মার্চ ১৯৭৯: সাভার সেনানিবাস অসন্তোষ।
- ২১ জুন ১৯৭৯: ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টা ও কয়েকজন সেনার বিচার।
- ২১ মার্চ ১৯৮০: সেনা ও বামপন্থীদের সহযোগে জিয়াকে সরকার থেকে অপসারণ চেষ্টা।
- ১৭ জুন ১৯৮০: জাসদপন্থি ও জিয়াবিরোধী সেনাদের অভ্যুত্থানচেষ্টা।
- ১৩ অক্টোবর ১৯৮০: ঢাকা সেনানিবাসে জিয়া সরকার অপসারণচেষ্টা।
- ৩০ মে ১৯৮১: জেনারেল মঞ্জুরের চট্টগ্রামে অভ্যুত্থান ও জিয়া হত্যা।
- ১ জুন ১৯৮১: মঞ্জুরের সহযোগিদের পালানোর চেষ্টা ও সেনাদের হাতে ধরা পরা।
- ২৪ মার্চ ১৯৮২: এরশাদের অভ্যুত্থান, ক্ষমতাদখল ও সামরিক শাসন জারি।
- ১৭ নভেম্বর ১৯৮২: এরশাদের বিরুদ্ধে কর্নেল ফারুক ও কর্নেল রশিদের অনুসারীদের অসন্তোষ।
- ২৪ মে ১৯৮৩: এরশাদবিরোধী সামরিক বাহিনীদের পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে আরেকটি অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
- ৪ আগস্ট ১৯৮৩: ঢাকা ও বগুড়া ঘাঁটিতে সেনা অভ্যুত্থান ও তাদের দমন।
- ১২ মে ১৯৮৭: এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় সেনাসদস্যদের অভ্যুত্থানচেষ্টা।
২০০৭ সালে খালেদা জিয়াকে ক্ষমতা থেকে সরানো আর ২০২৪ সালের হাসিনা সরকার পতন ও পুনরায় সামরিক শাসন শুরুর উদ্দেশ্যেও সেনারা পরিকল্পনা করেছিল বলে শোনা যায় কিন্তু তার শক্ত প্রমাণ মিলেনি, তাই তা হিসেবে ধরছি না।
একই টাইমলাইনে হয়েছে প্রায় সবগুলো প্রমাণিত বিদ্রোহ। কারণ কী ভেবেছেন কখনো?
অবশ্য এর বাহিরে একটি সামরিক বিদ্রোহ হয়েছে। তা সরকার পতনের মতো বড় কোনো উদ্দেশ্যে ছিল না, মূলত বেতন ও সামাজিক পদমর্যাদার অসন্তোষই ছিল এই বিদ্রোহের মূলে বলে মনে করা হয়। ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯, হয়েছিল পিলখানার ঐতিহাসিক ও মর্মান্তিক সেই বিডিআর বিদ্রোহ। যেখানে ৩৬ ঘন্টার বিদ্রোহে প্রাণ হারায় ৫৭ জন সেনাসহ মোট ৭৪ জন। ভেঙে দেয়া হয় বিডিআর (Bangladesh Rifles), জন্ম নেয় বিজিবি (Border Guard Bangladesh)।
যাই হোক, একই সময়ে এতগুলো সেনা অভ্যুত্থানের কারণটা হলো বাটারফ্লাই ইফেক্ট। এক জায়গায় কিছু হলে অরেক জায়গায়ও তার ধারাবাহিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের মনে পরে আরে এই সমস্যাতো আমাদেরও আছে! আসলে পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ কি করছে তা চিন্তাই করে না। শুধু অন্যকে অনুসরণ করছে। যারা চিন্তাটা করে তারাই মূলত সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান বা হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদকে কল্পনা করুন। তারা চিন্তা করেছে, অন্যরা শুধু অনুকরণই করেছে। তারা করেছে বলেই তারা এত শক্তিশালী হতে পেরেছে, প্রত্যেকের নিজস্ব মত থাকলে তা কোনোদিনই সম্ভব হতে পারতো না।
(ছবি ও তথ্য গুগল থেকে সংগ্রহ করা)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন