ফারহান সাদিক (সংগ্রাম) এর কাব্যগ্রন্থ ‘আগুনের গান ও অন্যান্য’ আর ‘গোরস্তানের দারোয়ান’ নিয়ে কোনো প্রকাশনী কাজ করতে চাইলে যোগাযোগ করুন।

আসলেই কি ভালো ছিল অবিভক্ত পাকিস্তান?


ইদানিং প্রায়ই শোনা যায় পাকিস্তান থাকলেই ভালো হতো। অনেক দেশের ভিসা থাকতো, সুন্দরী বউ থাকতো কিংবা বিশ্বকাপ থাকতো এমন অনেক রকম উদ্ভট চিন্তাভাবনা করতে দেখছি সবাইকে। সেদিনের পাকিস্তান আসলে কেমন ছিল চলুন তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করি। চিন্তা করবেন না, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের প্রচারিত তথ্য দিবো না, আপনাদের বায়াস মনে হতে পারে। তার আগের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করি। পুরো চিত্রটাই বাংলাদেশ হবার আগ পর্যন্ত।

বিশ্বযুদ্ধের পর কলোনি চালানোর মতো ক্ষমতা যখন আর ব্রিটিশদের ছিল না, শাসনের অবসান ঘটিয়ে একে একে সব দেশকে স্বায়ত্বশাসন দিয়ে কেটে পড়তে শুরু করলো ব্রিটেন। ১৯৩৭ সালেই ব্রহ্মদেশ/বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কারণে বিরক্ত হয়ে নিজেদের ভারতবর্ষ থেকে আলাদা জাতি ঘোষণা করে। তারা ইংরেজদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার চেয়ে ভারতীয়দের (অবশ্যই ভেতরে পাকিস্তানীরাও আছে, কারণ তখন পাকিস্তান বলে আলাদা কিছু ছিল না) থেকে রক্ষা পাওয়া জরুরী মনে করেছিল। ফলে ব্রিটিশদের অধীনে থেকেও ভারতীয় কলোনি ও বার্মা কলোনি আলাদা হয়ে যায়। মাশুলও দিতে হয়েছে, ১৯৪৭ সালে যখন দেশভাগ হয় তখন বার্মার স্বাধীনতা মিলেনি। সে স্বাধীনতা পেয়েছিল আরো এক বছর পর।

যাই হোক তখন ভারতবর্ষের ক্ষমতা কার হাতে যাবে ঐটাই ছিল আসল চিন্তা। কংগ্রেস চাচ্ছিলো হিন্দু নেতাদের হাতে ক্ষমতা যাক আর মুসলিম লীগ চাচ্ছিলো মুসলিম শাসন। তাই যখন কৃষক-প্রজা দলের শেরে বাংলা লাহোর প্রস্তাব পেশ করে মুসলিম লীগ তা লুফে নেয়, আর উত্থান ঘটে জিন্নাহর। সে দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবর্তন করে। সে দাবি করে ভারতবর্ষে সব মিলিয়ে দুটি জনগোষ্ঠি আছে যাদের ধর্ম-উৎসব-রীতিনীতি সব আলাদা, তাদের আলাদা আলাদা রাষ্ট্র দেয়া উচিত। যদিও এই তত্ত্বের খোদ শেরে বাংলাই বিরোধীতা করেছিল কারণ সে চাচ্ছিলো জাতির ভিত্তিতে দেশভাগ হোক, ধর্মের ভিত্তিতে না। এতে এক অফূরন্ত যুদ্ধের সূচনা হবে দু’ধর্মের মধ্যে এটাই ছিল তার মত। পাক-ভারতের নিয়মিত যুদ্ধ তার দূরদর্শীতারই প্রমাণ।

বিভিন্নভাবে দেশ ভাগের পরিকল্পনা করা হয় কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনোভাবেই কংগ্রেস আর মুসলিম লীগকে একমত করা যাচ্ছিলো না। তো শেষ পর্যন্ত দু’পক্ষই যাদের চায় ঐসব অঞ্চলে ভোট করার সিদ্ধান্ত নেয় ব্রিটিশ রাজ।

গণভোট হয়েছিল দুটি অঞ্চলে সিলেট ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে। দুটোতেই পাকিস্তান জয়ী হয়ে যায়। কংগ্রেসের ক্ষমতা ছিল সংসদে। তাই পরবর্তী নির্বাচনগুলো তারা চায় অজ্ঞ নাগরিকদের পরিবর্তে সচেতন সংসদ সদস্যের ভোটে নির্ধারণ হোক। প্রাদেশিক আইনসভার ভোট হয় পাঞ্জাব, বাংলা ও সিন্ধু এই তিন রাজ্যে। পাকিস্তানের জয় হয় সিন্ধুতে। পাঞ্জাব আর বাংলায় যেহেতু ভোটের ব্যবধান সমানে সমান ছিল তাই ভারত-পাকিস্তান দু’দেশের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয় এই দুই রাজ্যকে।

তবে মুষ্ঠিমেয় কিছু মানুষের ভোটে বাংলা দুইভাগ হওয়ার বিরোধীতা করেছিলেন অনেকে। তারা চেয়েছিল যেদেশেই যাক বাংলা বা বঙ্গ অখণ্ড থাকুক। জন্ম নেয় বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন।

কোনো বিতর্ক ছাড়াই অন্যান্য রাজ্য যোগ দেয় দুটো দেশে। আর স্বাধীন থাকার ঘোষণা দেয় হায়দরাবাদ, জম্মু ও কাশ্মীর, কালত, সিকিম, ভুটান (ভুটান বৌদ্ধ হবার কারণে হিন্দু-মুসলিম কোনো জোটকেই নিরাপদ মনে করেনি)। অন্যদিকে জুনাগড়ের নবাব পাকিস্তানে যোগ দিতে চেয়েছিল কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুু জনগণের ভোটে শেষ পর্যন্ত ভারতে যোগ দেয়। অন্যদিকে জম্মু ও কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং স্বাধীন থাকার ঘোষণা দিলেও পাকিস্তানের উপজাতিদের থেকে আক্রান্ত হলে ভারতের সাহায্য চায়, ভারত সুযোগে এটাকে নিরাপত্তার বিনিময়ে ভারতের অংশ হিসেবে চুক্তি স্বাক্ষর করিয়ে নেয়।

দেশভাগের পরও কিন্তু এই দুই দেশ অনেক ছোট ছোট দেশকে গিলে খেয়েছে। পাকিস্তান গিলেছে বাহাওয়ালপুর (১৯৪৭-দেশভাগের পরপরই ধনী রাজ্য হওয়ায় দখলে নেয়), কালত (১৯৪৮-বালুচিস্তানের এই রাজ্য সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে দখল করে), গদর (১৯৫৮) এবং স্বাত-চিরত্রাল-হুনজা-গিলগিত (১৯৬৯-এই পার্বত্য রাজ্যগুলোর ওপর আধিপত্য নিশ্চিত করে পাকিস্তান)। অন্যদিকে ভারত গিলেছে জম্মু-কাশ্মির (১৯৪৭- মহারাজার ‘Instrument of Accession’ স্বাক্ষরের মাধ্যমে), হায়দরাবাদ (১৯৪৮-অপারেশন পোলো সামরিক অভিযানে), পন্ডিচেরি (১৯৫৪-ফরাসিদের থেকে ভারতের নিয়ন্ত্রণে), গোয়া-দমন-দিউ (১৯৬১-পর্তুগিজদের থেকে দখলে নেয় ভারত) ও সিকিম (১৯৭৫-গণভোটে)। 

একটু ভালো করে খেয়াল করুন। উপনিবেশিক শাসনের শেষ হয়েছে কিন্তু উপনিবেশ বানানোর চিন্তাধারা তখনো রয়ে গেছে। আরেকটা বিষয় হলো পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তনের হয়ে সেভেন সিস্টার বা বঙ্গের পুরোটা নিজেদের অধীনে নেয়ার চেষ্টাই করেনি। তাদের অবস্থান ছিল ঠিক তার উল্টো। কারণ পাকিস্তান যখন জিন্নাহের মানে পশ্চিমের অধীনে ছেড়ে যাওয়া হয় তখন সব নিয়োগ, মন্ত্রনালয় ও সুযোগ-সুবিধা তাদের হাতেই চলে যায়। উদাহরণ দিয়ে বুঝাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বর্তমানে নিয়োগ দেয়া হয় সর্বোচ্চ এটা নিপাতনে সিদ্ধ। পাকিস্তান আমলেও এই স্বজনপ্রীতি ছিল। ফলে শীঘ্রই ব্রিটিশদের ছেড়ে যাওয়া খালি পদগুলো ভরাট করে নিলো পশ্চিম পাকিস্তানিরা, আমলাতন্ত্র চলে গেলো পশ্চিমের নিয়ন্ত্রণে।

তাদের কাছে পূর্ব পাকিস্তান একটা কলোনির মতোই ছিল। বাংলার জনসংখ্যা ছিল বেশি। ফলে তাদের ভয় ছিল এর সীমানা বাড়ানো হলে জনসংখ্যা আরো বাড়বে, ভোটও বাড়বে, এই রিস্ক পাকিস্তান নিতে চায়নি। উল্টো পশ্চিমের সীমানা ও জনবল বাড়াচ্ছিলো। কিন্তু এই সীমানা বাড়ানোর ধকলটা পরছিল পুরো দেশের ওপরই। যুদ্ধ মানেই খরচ। কিন্তু ওপাশে উচুদরের চাকরি ছিল, এপাশে ছিল না যার কারণে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি ব্রিটিশ আমলের চেয়েও খারাপ হতে থাকে।

এরই মধ্যে শুরু হয় ১৯৫৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ। পাকিস্তানের সৈন্য ছিল তুলনামূলক কম। পাকিস্তানের জেনারেলরা ভয়ংকর এক পরিকল্পনা করে। যা "The defense of the East lies in the West" নামে পরিচিত। তারা সব সৈন্য পশ্চিম পাকিস্তানে জমা করে আর পূর্ব পাকিস্তানকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে। পরিকল্পনাটা ছিল বাংলা দখল কর আমরা পাঞ্জাব নিয়ে নিবো। কারণ পশ্চিমে পাকিস্তানের শক্তি তখন ভারতের চেয়ে অনেক বেশি।

ভারত ফাঁদে পা দেয়নি কিন্তু পাকিস্তান ততদিনে খাল কেঁটে ফেলেছে। পশ্চিম পাকিস্তানের আর বুঝতে দেরী নেই পাকিস্তান সরকারের কাছে পূর্ব পাকিস্তান শুধু ব্যবহারেরই জিনিস। বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান হয়। বাঙালিরা খতিয়ে দেখতে শুরু করে তাদের সাথে এতদিন ধরে কি কি অবিচার করে আসছে পশ্চিম পাকিস্তান। তার চেয়ে বড় কথা, পাকিস্তান ভবিষ্যতে আবার পূর্ব পাকিস্তানকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করতে না এমন নিশ্চয়তা ছিল না।

সোহরাওয়ার্দীরা একে একে মুসলিমলীগ থেকে সরে যায়, ভাগ হয়ে যায় বিভিন্ন ছোট ছোট দলে। শেষ পর্যন্ত যখন বাঙালিরা বুঝতে পারে এভাবে আলাদা আলাদাভাবে কিছু হবে না, সবাইকে একজোট হতে হবে তখনই প্রায় বাংলার সব রাজনৈতিক দলগুলো মিলে গঠন করে যুক্তফ্রন্ট। পশ্চিম পাকিস্তানীদের হাতে ঐতিহাসিক জয় হয় বাংলার। প্রথমবার বাঙালিরা মন্ত্রীপরিষদ গঠন করে। তবে বাঙালির এই বিজয় পশ্চিম পাকিস্তান খুব সহজেই ভেঙে দেয়। সামরিক শাসন জারি হয়। ক্ষমতা ফিরে যায় পশ্চিম পাকিস্তানের জেনারেলদের হাতে।

যখন একটা ভূখণ্ড সরকারকে সমান হারে কর দিবে, সমান সুযোগ-সুবিধাতো তারা চাইবেই। তার ওপর সরকার যদি তাদের নিরাপত্তা দিতেও অস্বীকার করে তখন দেশভাগ ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। বর্তমানে ভারতের সেভেন সিস্টার ও পাকিস্তানের বালুচিস্তানের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন কেন এই অসন্তোষ। কেন তারা স্বাধীনতা চায়? তাদের কী স্বদেশপ্রেম নেই? তাদের স্বদেশপ্রেম আছে বলেই তারা স্বাধীনতা চায়, তারা নিজের ভূখণ্ডের শোষণ চায় না। তারা চায় তাদের ভূখণ্ড থেকে সরকার যতটা নিচ্ছে, ততটাই আউটপুট তাদের দিক। যদি দিতো তবে আর অবহেলায় তাদের এত আন্দোলনই করতে হতো না। এটা অস্বাভাবিক চাওয়া না। ন্যায্য অধিকার চাওয়াও প্রত্যেকের মৌলিক অধিকার।

আর হ্যা, দেশভাগ না হলে আজ ধানক্ষেতেই থাকতে হতো হয়তো, ভিসা আর পাকিস্তানি নারীর স্বপ্ন আর দেখতে পারতে না।।

মন্তব্যসমূহ

FS Quote

জনপ্রিয় পোস্টগুলো