ফারহান সাদিক (সংগ্রাম) এর কাব্যগ্রন্থ ‘আগুনের গান ও অন্যান্য’ আর ‘গোরস্তানের দারোয়ান’ নিয়ে কোনো প্রকাশনী কাজ করতে চাইলে যোগাযোগ করুন।

মক্কা প্যাক্ট কী? যোগ দিলে কার কী লাভ?

মক্কা জোট একটা সামরিক প্রতিরক্ষা জোট। বড় দেশগুলো থেকে নিজেদের নিরাপত্তা দিতে এসব জোট গঠন করা হয়। সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইউরোপের ন্যাটো।
(ন্যাটো শুধু সামরিক জোট নয়। সামরিকের পাশাপাশি অন্যান্য যৌথ সেবাও দেয় সদস্য দেশগুলোর নাগরিকদের।)
প্রথমেই স্পষ্ট করছি, এটা প্রতিরক্ষার জোট। কোনো দেশ এ জোটের কোনো দেশে আক্রমণ চালালে প্রত্যেকটা দেশ সর্বসম্মতিতে তার প্রতিরক্ষায় সেনা পাঠাবে। জোটের কোনো দেশ নিজেই গিয়ে যুদ্ধ বাঁধালে সহায়তা করবে না।
তুরস্ক মক্কা জোটে সদস্য সংখ্যা মাত্র তিনটিতে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না বলার পর থেকেই অনেক মুসলিম দেশ তাকে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বর্তমানে বিশ্বে এই জোটে অংশ নিতে পারে বলে আলোচনায় বাংলাদেশ, ইরান ও মিশর। ইরান ও বাংলাদেশ সরাসরি যোগ দিতে আগ্রহী। মিশরও বলেছে তারা যোগ দেয়ার বিষয়ে ভাবছে। ইরান-সৌদি এক জোটে চলে এলে শিয়া-সুন্নির দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন ভেঙে সব মুসলিম দেশ যে তাতে যোগ দিতে চাইবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাছাড়া বিশ্বে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনের কারণে বাংলাদেশের সুনাম রয়েছে। যার কারণে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত ইসরায়েল ও ভারতের গণমাধ্যম। বাংলাদেশ এ জোটে চলে গেলে শুভেন্দুর ভাষণ দিতে অবশ্য একটু কষ্ট হবে। কথায় কথায় বাংলাদেশ-কাশ্মির দখল করতে চাইলেও কেউ আমলে নিবে না। কারণ জানবে তা আর হবে না। প্রতিরক্ষায় আছে তুরস্কের মিসাইল, পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র, সৌদি ও মিশরের আর্থিক সাপোর্ট, বাংলাদেশের শান্তি রক্ষা মিশন আর ইরানতো একাই একশো।
এখন কথা হলো, সবাই নিজ নিজ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতেই এই জোটে যোগ দিতে চায়। কিন্তু কার কী চাওয়া? তা অবশ্য অপ্রকাশিতও নয়।

প্রথমে যে তিন দেশ ইতিমধ্যে এই জোটে আছে তাদের কথা বলি।

১. সৌদি আরব: এতদিন সৌদি আরবের নিরাপত্তার একটা বড় অংশের দায়িত্বে ছিল মার্কিন সেনারা। ইরানি মিসাইলের ভয়ে সেই অংশ এখন সৌদি থেকে সরে গেছে। সৌদিও বুঝে গেছে, মার্কিন সেনাদের বিপদে পাশে পাবার থেকে, পাশে রাখার বিপদ বেশি। আর এই অল্প ব্যবধানের মধ্যে নিজস্ব প্রশিক্ষিত সৈন্য বানানোও সম্ভব না। এটা সময়সাপেক্ষ কাজ। তাই সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের টানাপোড়েনে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই জোটে এসেছে।
২. তুরস্ক: তুরস্ক আগে থেকেই ন্যাটো জোটে আছে। তার আলাদা করে নিরাপত্তার ততটা প্রয়োজন ছিলো না। সে এসেছে ব্যবসা করতে। ইউক্রেন যুদ্ধ ও ইরান যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করতে মিসাইল কতটা কার্যকর। আর তুরস্কের শক্তিই মিসাইল। ন্যাটো জোটে থাকার কারণে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ইউক্রেনকে মিসাইল দিয়ে সাহায্য করেছিল তুরস্ক। যেই মিসাইল সিস্টেম নিয়ে গান পর্যন্ত লিখেছিল ইউক্রেনীয় সৈন্যরা। তাছাড়া যুদ্ধ বিমান তৈরিতেও তাদের অবস্থান মজবুত। তুরস্ক নিজেদের সামরিক খাতের একটা বড় বাজার তৈরি করতে চাচ্ছে। এজন্যই তুরস্ক অন্যান্য দেশকে জোটে আনতে আগ্রহী।
৩. পাকিস্তান: কাশ্মিরে ভারত জঙ্গি ধরার নামে কোটি কোটি টাকা খরচে অগ্রাসন চালায় প্রায়ই। পাকিস্তান চাইছে চিরতরে তার সীমানা নিরাপদ করে নিতে। তুরস্কের বিমান ও মিসাইল টেকনোলজি পাকিস্তানের হাতে চলে এলে বুদ্ধি থাকলে আর চোখ রাঙানোর সাহস করবে না ভারত এমনটাই পাকিস্তানের ধারণা।

তাছাড়া আলোচিত তিন দেশ কেন যেতে চায় সে বিষয়ে আসি।

১. বাংলাদেশ: পাশেই মিয়ানমার ও ভারত। একটাতে যুদ্ধ চলমান, আরেকটা যুদ্ধের অপেক্ষায়। শুভেন্দুরাতো নিয়মিত চেষ্টা করে যাচ্ছে যেন ভারত-বাংলাদেশ একটা ক্যাচাল বাঁধে। ভারতের অবিভক্ত ভারতের স্বপ্ন আর বাংলার কাউন্টার অখণ্ড বাংলা প্রতিষ্ঠা বা সেভেন সিস্টার স্বাধীন করে দেয়ার প্রতি হুমকিতে পরিস্থিতি দিনদিন খারাপের দিকেই যাচ্ছে। তাছাড়া বাংলাদেশের রংপুর দখল ও চট্টগ্রাম দখল ভারতীয় একদল উগ্রবাদীর স্বপ্ন। যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ালে যে দেড়শো কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে ষোল কোটি জনসংখ্যার দেশের প্রতিরোধ করতে কালঘাম ছুটবে এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই বাংলাদেশ দলে ভিড়তে চাচ্ছে। তুরস্কের মিসাইল সিস্টেমের ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী বাংলাদেশ।
২. ইরান: অনেক আগে থেকেই ইরান এই জোট চায়। ইরান ভালো করেই জানতো ইরাকের পর যেই মুসলিম দেশ প্রথম আক্রান্ত হবে তা হলো ইরান। তাই সে প্রস্তুতি নিয়েছে, এবং বারবার এমন একটা জোটে একজোট হবার চেষ্টা করেছে যাতে আমেরিকা বা ন্যাটো তাদের ওপর চড়াও না হতে পারে। এজন্যই তারা ফিলিস্তিন ও লেবানন সাপোর্ট দিয়ে আসছে দীর্ঘদিন।
৩. মিশর: মরুভূমি হবার কারণে মিশরের জনসংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম। যা আছে তা আজও নীলনদ কেন্দ্রিকই বলা যায়। ফলে নিজস্ব সৈন্যও তুলনামূলক কম। মধ্যপ্রাচ্য যেহেতু ইতমধ্যে যুদ্ধের মধ্যে আছে আর ইসরাইলের গ্রেটার ইসরায়েল স্বপ্নে মিশরের একটা অংশও আছে তাই মিশরও নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবছে।

যারা মনে করেন ‘মক্কা প্যাক্ট’ অপ্রয়োজনীয় জোট বা বাংলাদেশ-পাকিস্তানের সম্পর্ক জোড়ালো করতে বা পার্শ্ববর্তী কোনো দেশে আক্রমণ চালাতে তৈরি হচ্ছে তারা ঘুম থেকে জাগুন। কোনো কিছুই অপ্রয়োজনে হচ্ছে না। প্রত্যেকে যোগ দিচ্ছে ও দিতে চাচ্ছে নিজ নিজ প্রয়োজনের তাগিদে। প্রত্যেকের একটা উদ্দেশ্য আছে।
যদিও ইরান যুদ্ধই এই জোটের সুযোগ করে দিয়েছে, তবু যতদূর আন্দাজ করা যাচ্ছে আপাতত ইরানকে বাহিরেই রাখা হবে, কারণ জোটে নেয়া মানেই আমেরিকা-ইরান যুদ্ধে শুরুতেই ঢুকে পরা। তাই যুদ্ধের পর যুক্ত হতে চলেছে ইরান এটা নিশ্চিত।
বিঃদ্রঃ এমন এক জোটের আমন্ত্রণ পেয়েছিল বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালে ৫-৯ সেপ্টেম্বরে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে, গাদ্দাফির কাছ থেকে। যদিও তখন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই প্রস্তাব নাকোচ করে দেন। কারণ তিনি দেশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্ম নিরপেক্ষ রাখতে চেয়েছিল। তবে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই সম্মেলনের প্রত্যেক রাষ্ট্রনায়ক রহস্যজনকভাবে বা প্রকাশ্যে খুন হয়েছিল।

ভারত কী রাশিয়া যেমন ন্যাটোতে যোগ দেয়ায় ইউক্রেনে হামলা চালিয়েছিল তেমনভাবে বাংলাদেশে হামলা চালাবে?

অনেকে এই সন্দেহ করলেও, এই সন্দেহ অমূলক। প্রথমত ভারত রাশিয়া না। ভারতের জ্বালানি, বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স আসার এক বড় মাধ্যম সৌদি আরব। তাছাড়া তুরস্কের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যও ১০-১২ বিলিয়ন ডলারের মতো। তাই ভারত এত বোকা নয় যে এই দু’দেশের বিরোধিতা করে সরাসরি হামলা করবে। 

মন্তব্যসমূহ

FS Quote

জনপ্রিয় পোস্টগুলো