গত কয়েকদিন বিভিন্ন ধরনের ছন্দ নিয়ে লেখছি। একটা ছন্দ নিয়ে না লেখলে এই ছন্দ বিষয়ক লেখাটা হয়তো অপূর্ণই থেকে যাবে।
বঙ্কিম থেকে রবীন্দ্রনাথ ঐসময়ের সব এলিট সংস্কৃত পাঠকের মনে দাগ কাঁটা এক ছন্দ- মন্দাক্রান্তা। বাংলায় নামের অর্থ দাঁড়ায় মন্থরগতির ছন্দ। এই ছন্দে লেখা কবিতা চাইলেই দ্রুত পড়তে পারবেন না, তাই এমন নাম। এই মন্থরগতি দুঃখকে অনেক ভারি করে তুলতে পারতো। কিন্তু এই ছন্দের পূজো করলেও কেউ পুরোপুরি এই ছন্দটাকে বাংলা সাহিত্যে নিয়ে আসতে পারেনি। এর কারণ বলা হয়, বাংলা অনেক সরল ভাষা। রবীন্দ্রনাথ মন্দাক্রান্তার অনুকরণে নিজস্ব ছন্দ তৈরির চেষ্টাও করেছিলেন। যেখানে রবীন্দ্রনাথের সেই ছন্দ মন্থর হয়ে যায় ঠিকই কিন্তু মন্দাক্রান্তা ছন্দ কাঠামোর সাথে তার হুবুহু মিল ছিল না। যদিও রবীন্দ্রভক্তরা দাবি করেন, রবীন্দ্রনাথ আগের মন্দাক্রান্তা ছন্দের নিয়ম ভেঙে মন্দাক্রান্তা ছন্দকে বাংলায় নতুন রূপ দিয়েছে।
আসল মন্দাক্রান্তা ছন্দের দল সংখ্যা
মন্দাক্রান্তা ছন্দ সংস্কৃতের এক জটিল ছন্দ। ব্যাকরণে খুব কড়াকড়ি। বর্তমানের হিসেবে স্বরবৃত্তের একটা ক্যাটাগরি। ছন্দের হিসেবে ১৭ দলের বিশেষ ধরনের স্বরবৃত্ত।
দল আসলে কী?
যারা জানেন না, তাদের বলি, দল এর ইংরেজি হলো সিলেবল। আমরা আসলে কোনো শব্দকে টুকরো টুকরো করে উচ্চারণ করি। প্রত্যেকটা টুকরো একেকটা দল বা সিলেবল।
দল আলাদা করার সবচেয়ে সহজ উপায় দলকে আলাদা লিখে পড়লে আর শব্দের মধ্যে রেখে পড়লে উচ্চারণ একই থাকে।
অনেকসময় একটা যুক্তবর্ণও দুটো দলে চলে যেতে পারে। যেমন: “লক্ষ” ভাঙলে দুটি দল “লক্” ও “খ(অ)”। এখানে বলে রাখি দল কিন্তু বর্ণের থেকে উচ্চারণের ওপর বেশি নির্ভরশীল।
দলের উদাহরণ দেই। ধরুন, “আমরা” একটা শব্দ। এটাকে আমরা ২ দলে ভাগ করতে পারি। “আম” ও “রা”। “ম” আলাদা উচ্চারণ করার চেষ্টা করে দেখুন, হুবুহু উচ্চারণ পাবেন না।
মুক্তদল ও রুদ্ধদল পার্থক্য কী?
এখন ঐ দলটা যদি স্বরধ্বনি দিয়ে শেষ হয় তবে তা মুক্তদল আর ব্যঞ্জনধ্বনি দিয়ে শেষ হলে বদ্ধদল। তাই এখানে “আম” বদ্ধদল ও “রা” মুক্তদল।
তবে মন্দাক্রান্তা শেখার জন্য মুক্তদল-রুদ্ধদলের চেয়ে জরুরী লঘুস্বর আর গুরুস্বর আলাদা করতে পারা।
লঘুস্বর আর গুরুস্বর পার্থক্য কী?
যেই দল উচ্চারণে অনেক সময় লাগে সে গুরুস্বর আর যার কম লাগে সে লঘুস্বর।
কিন্তু এটাতো এক সমস্যা! কতটুকু সময় খরচ হলে তা লঘু আর কতটুকুইবা খরচ হলে গুরু?
সুখবর হলো, সব বদ্ধাক্ষরই গুরুস্বর। কিন্তু মুক্তদলের মধ্যে হ্রস্যধ্বনি (অ, ই, উ, ঋ, এ, ও) উচ্চারণে শেষ হওয়া দল লঘুস্বর আর দীর্ঘস্বরযুক্ত মুক্তাক্ষরও (অর্থাৎ আ, ঈ, ঊ, ঐ, ঔ যুক্ত অক্ষর) গুরুস্বর।
আরও সহজে বললে শুধু অ, ই, উ, ঋ, এ, ও উচ্চারণে শেষ হওয়া দল লঘু আর বাকি সব দল গুরু। মানে “আম” আর “রা” দুটোই গুরুস্বর। তাহলে লঘুস্বর? আরেকটা শব্দ ধরুন, “তখনো”। প্রায় সবই ব্যঞ্জনবর্ণ তাই না? কিন্তু মজার ব্যাপার হলো উচ্চারণে সবগুলো তল মুক্তদল ও লঘুস্বর। কিভাবে? আবার পড়ে দেখুন তিনটা দল এখানে। “ত”, “খ” ও “নো” এর “ত” ও “খ” এর শেষে উচ্চারণ করছি “অ” আর “নো” এর শেষেতো “ও” স্পষ্টই আছে। এখন আশা করি বুঝতে পারছেন, বর্ণের থেকে উচ্চারণের ওপর বেশি নির্ভরশীল কেন বলেছিলাম?
এই লঘুস্বর আর গুরুস্বর শিখাচ্ছি কেন?
কারণ মন্দাক্রান্তার কোন দলটা গুরু হবে আর কোন দল লঘু হবে তাও আগে থেকেই ঠিক করে রাখা আছে। গুরুস্বরকে গ আর লঘুস্বরকে ল ধরলে, মন্দাক্রান্তার প্রতিলাইনের ১৭টা দলের বিন্যাস: গগগগ-লললললগ-গলগগলগগ
এটাকে ছন্দশাস্ত্রে ম গণ-ভ গণ-ন গণ-ত গণ-ত গণ-গগ দিয়ে মনে রাখা হয়।
এর মানে দাঁড়ায়, গগগ-গলল-ললল-গগল-গগল-গগ।
আরো সহজ হতো, ৪ গুরু-৪ লঘু-য গণ-য গণ-য গণ এভাবে মনে রাখলে। যদিও এভাবে শুধু আমিই মনে রাখি।
গণ আবার কী জিনিস?
ছন্দশাস্ত্রে তিনটা করে দলকে একত্রে গণ বলতো।
- গগগ=ম গণ
- গগল=ত গণ
- গলগ=র গণ
- লগগ=য গণ
- গলল=ভ গণ
- লগল=জ গণ
- ললগ=স গণ
- ললল=ল গণ
এখানে ভুলবশত ভগণের জায়গায় জগণ দিয়ে দিলেই, আপনার পুরো ছন্দ বাতিল। এটা আর মন্দাক্রান্তা থাকবে না। সাধারণ স্বরবৃত্ত হয়ে যাবে।
এতটাই জটিল ছিল এই ছন্দ। অথচ এই ছন্দ ব্যবহার করেই কালিদাস “মেঘদূতম্” এর মতো ৪০০ থেকে ৫৫০ লাইনের বিশাল এক রোমান্টিক কবিতার জন্ম দেন।
লাইন সংখ্যার তারতম্যের কারণ ঐ সময়ে হাতে লেখা কপিগুলোতে প্রায়ই লাইন বাদ পরে যেতো। কোথাও কোথাও আবার পুঁথিলেখক নিজের লেখাকে অমরত্ব দিতেই দু-একটা শ্লোক নিজেই জুড়ে দিতো। এমন শ্লোকগুলো গবেষকরা আলাদা করার চেষ্টা করেছেন দীর্ঘদিন। এগুলেোকে প্রক্ষিপ্ত শ্লোক বলে। তাই আলাদা আলাদা গবেষকের তথ্যে আসল লাইন সংখ্যা নিয়ে মতবিরোধ দেখা য়ায়।
যাই হোক, এই “মেঘদূতম্” বিশ্বসাহিত্যে দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করে। যার কারণে দূতকাব্য নামে নতুন এক রোমান্টিক কবিতার ধারা জন্ম নেয়। যেখানে ফুল, আকাশ, মেঘ কিংবা তারাকে দূত করে প্রিয়াকে কাছে চিঠি পাঁঠায় প্রেমিক।
না, আমি এই ছন্দে কবিতা লেখার সাহস দেখাচ্ছি না। এই ছন্দ বাংলায় আনতে অনেক বাঘা-বাঘা কবি আগেই চেষ্টা করেছেন। আমি আর কে?
মেঘদূতের আমি যেই অনুবাদ করছি তা হবে ৪+৬+৭ অক্ষরের অক্ষরবৃত্তে লেখা। মানে ১৭ দলের মাত্রাবৃত্তকে ১৭ অক্ষরের অক্ষরবৃত্তে সাজাতে যাচ্ছি আমি।
এককথায় মন্দাক্রান্তা ছন্দ
মন্দাক্রান্তা হলো ১৭ দলের স্বরবৃত্ত, গগগ-গলল-ললল-গগল-গগল-গগ হলো প্রতি চরণের দল বিন্যাস।আপনি কী এই ছন্দ ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ নিবেন?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন