জিডিপি বৃদ্ধি মানেই কী উন্নতি?
জিডিপি বাড়া নিয়ে সরকার হইচই করে। সব দেশের সরকারই করে। কিন্তু এটা আসলে একটা প্রোপাগান্ডা।
হ্যা, ঠিকই শুনেছেন, Gross Domestic Product (GDP) বাড়ছে বলে প্রতিটা দেশের সরকার রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা চালায়। আবার বড় দেশগুলোও আমাদের জিডিপি বেশি মানে আমরা অনেক উন্নত এমন একটা ধারণা জনমনে গেথে দেয়।
আসলে Gross Domestic Product (GDP) এর মানে হলো, ঐ দেশের সীমানার ভেতরে বছরে কত টাকার প্রোডাক্ট তৈরি হলো।
নিশ্চয়ই ভাবছেন তাহলে এই প্রোডাক্ট উৎপাদন বাড়লে ক্ষতি কী? এটার বৃদ্ধিই তো উন্নতি। বিষয়টা আসলে এত সহজ না।
আসলে ডলারের মানটা বাড়লেই যে উৎপাদন বেড়েছে তা কিন্তু নয়। হতে পারে, মূদ্রাস্ফীতির কারণে বা জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সংখ্যাটা বেড়েছে কিন্তু আসল উৎপাদন ক্ষমতা বাড়েনি।
নিশ্চয়ই ভাবছেন তাহলে এই প্রোডাক্ট উৎপাদন বাড়লে ক্ষতি কী? এটার বৃদ্ধিই তো উন্নতি। বিষয়টা আসলে এত সহজ না।
আসলে ডলারের মানটা বাড়লেই যে উৎপাদন বেড়েছে তা কিন্তু নয়। হতে পারে, মূদ্রাস্ফীতির কারণে বা জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সংখ্যাটা বেড়েছে কিন্তু আসল উৎপাদন ক্ষমতা বাড়েনি।
মাথাপিছু আয় বাড়লে?
মাথাপিছু আয় হলো, জনসংখ্যা দিয়ে মোট দেশজ উৎপাদন (GDP)-কে দেশের মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে যা আসে। মানে গড়ে প্রতিটা নাগরিক কত টাকার পণ্য উৎপাদন করছে।জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যাটাতো গেল, কিন্তু মূল্যস্ফীতি এখনও রয়ে গেছে।
চলুন, আজ হিসাব করবো, সত্যিই একটা দেশের কতটা উন্নতি হয়েছে।
আমি এ বিষয়ে একটা সূত্র ধার করানোর চেষ্টা করছি। তারপর জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার আলোচনায় যাবো।
ক্রয়ক্ষমতার সূত্র
পরম ক্রয়ক্ষমতার সূচক=দেশীয় বাজারে পন্যের দাম÷আন্তর্জাতিকভাবে পন্যের দাম।
ক্রয়ক্ষমতার সূচকে যথাক্রমে লুক্সেমবার্গ, আয়ারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, কাতার, ম্যাকাও, আমিরাত, সুইজারল্যান্ড, সান মারিনো, নরওয়ে ও আমেরিকা আছে সেরা দশে। ফ্রান্স ২৫, ইংল্যান্ড ২৭, ইরান ৮৯, ইরাক ১১৫, বাংলাদেশ ১৩৯, ভারত ১৪১, লেবানন ১৫২ ও পাকিস্তান ১৬২ নাম্বার অবস্থানে আছে এই সূচকে।
রাষ্ট্রীয় মানব উন্নয়ন সূচক সূত্র (HDI)
রাষ্ট্রীয় মানব উন্নয়ন সূচক=(মোট দেশজ আয়-মোট বৈদেশিক ঋণ)×(আন্তর্জাতিক মূদ্রায় কনভার্ট করা ক্রয়ক্ষমতার সূচক)÷জনসংখ্যারাষ্ট্রীয় মানব উন্নয়ন সূচক=(মাথাপিছু আয়-মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ)×(আন্তর্জাতিক মূদ্রায় কনভার্ট করা ক্রয়ক্ষমতার সূচক)
আন্তর্জাতিক মূদ্রায় কনভার্ট করা ক্রয়ক্ষমতার সূচক=PPP
আন্তর্জাতিক মূদ্রায় কনভার্ট করা ক্রয়ক্ষমতার সূচক=PPP
এখানে একই সাথে কোনো দেশে পণ্যের দাম কেমন জানা যায়, যা ডলারে কনভার্স করে মূদ্রার দামও হিসাবে নেয়া হয়।
রাষ্ট্রীয় মানব উন্নয়ন সূচককে পরিসংখ্যানের ভাষায় PPP GDP Mass Income Index-ও বলা হয়।
নিচে ২০২৩ সালের জাতিসংঘের HDI তালিকা দিলাম।
রাষ্ট্রীয় মানব উন্নয়ন সূচককে পরিসংখ্যানের ভাষায় PPP GDP Mass Income Index-ও বলা হয়।
নিচে ২০২৩ সালের জাতিসংঘের HDI তালিকা দিলাম।
সরকার যেমনটা প্রচার করে তা কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ বা ভারত কোনোটাই উন্নয়নশীল দেশ (০.৭১২+) নয়। সর্বশেষ পরিসংখ্যানে (২০২৩) বাংলাদেশ ও ভারত দুটোই ০.৬৮৫ স্কোর নিয়ে অবস্থান করছে ১৯৩ দেশের মধ্যে ১৩০তম স্থানে। মানব উন্নতির মাঝের গ্রুপে আছে এখনও।উন্নয়নশীল দেশ হতে হলে এই পরীক্ষায় ০.৭১২ স্কোর করতে হবে। ১১৭ র্যাংক করা দেশ সর্বশেষ উন্নয়নশীল দেশ। এমনকি গণহত্যার শিকার ফিলিস্তিনেরও ১৩৩তম। বাংলাদেশ-ভারত থেকে খুব বেশি দূরে নয়।
নেপাল ১৪৫, মিয়ানমার ১৫০, পাকিস্তান ১৬৮, আফগানিস্তান ১৮১ আর সোমালিয়া ১৯২ অবস্থানে আছে।
অবশ্য আশেপাশের শ্রীলঙ্কা ৮৯তম, মালদ্বীপ ৯৩তম আর ভুটান ১২৫তম অবস্থানে থেকে আমাদের থেকে এগিয়েই আছে।
এগুলো কী শতভাগ নির্ভুল?
না। এটাও শতভাগ নির্ভুল না। এটা গড় মান। যেসব দেশে শ্রৈণিবৈষম্য বেশি তাদের জন্য এটা ততটা কার্যকর না, কারণ জিডিপির একটা বড় অংশ ধনকুবেরদের হাতের মুঠোতেই থেকে যায়। যেমন আমেরিকা, ভারত, লুক্সেমবার্গ। তাই আলোচনায় আসে গিনি সহগ।
গিনি সহগ কী?
কোনো দেশের ধনীশ্রেণী ও দরিদ্রশ্রেণীর সম্পদের পরিমাণে তারতম্য কেমন তাই দেখায় গিনি সহগ! যেখানে ০ হলো কোনো শ্রেণী বৈষম্য নেই আর ১ হলো সর্বোচ্চ।
- মানব উন্নয়ন সূচক (IHDI)
রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন সূচকের সাথে (১-গিনি সহগ) গুণ করে হিসেব করা হয় এই মান।
এটাকে অবশ্য র্যাংকিং করা হয়নি, তবে গ্রাফ থেকে সহজে আন্দাজ করা যায় কোন দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান কেমন।
এটাকে অবশ্য র্যাংকিং করা হয়নি, তবে গ্রাফ থেকে সহজে আন্দাজ করা যায় কোন দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান কেমন।
এটা দেখায় দরিদ্রশ্রেণী কী অবস্থানে আছে। তার যথেষ্ট ক্রয়ক্ষমতা আছে কিনা।
আপনি জানলে অবাক হবেন, এই সূচকে ইরানের অবস্থান (০.৬৪৩) আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটা দেশের চেয়ে ভালো। মানে ঐ দেশের মানুষের অর্থনৈতিকভাবে জীবনমান আমাদের চেয়ে অনেক ভালো।
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এই সূচকে শ্রীলঙ্কা (০.৬৩) ও মালদ্বীপ (০.৬০২) কিছুটা উন্নত অবস্থানে আছে। মানে পৃথিবীর গড় মানের (০.৫৯) চেয়ে এগিয়ে আছে। বাংলাদেশ (০.৪৮২), ভুটান (০.৪৭৮), মিয়ানমার (০.৪৭৪, যদিও এটাকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ধরা হয় না), ভারত (০.৪৬৮) সীমার কিছু নিচে জড়াজড়ি করে আছে আর তার একটু নিচে আছে নেপাল (০.৪২৫)। মানে এগুলো এখনও দরিদ্রসীমার নিচে আছে। তবে পাকিস্তান (০.৩৬৪) ও আফগানিস্তান (০.৩২১) অনেক পিছিয়ে আছে। এটা প্রমাণ করে হতদরিদ্র মানুষের জীবনমান ভয়াবহ সেখানে।
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এই সূচকে শ্রীলঙ্কা (০.৬৩) ও মালদ্বীপ (০.৬০২) কিছুটা উন্নত অবস্থানে আছে। মানে পৃথিবীর গড় মানের (০.৫৯) চেয়ে এগিয়ে আছে। বাংলাদেশ (০.৪৮২), ভুটান (০.৪৭৮), মিয়ানমার (০.৪৭৪, যদিও এটাকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ধরা হয় না), ভারত (০.৪৬৮) সীমার কিছু নিচে জড়াজড়ি করে আছে আর তার একটু নিচে আছে নেপাল (০.৪২৫)। মানে এগুলো এখনও দরিদ্রসীমার নিচে আছে। তবে পাকিস্তান (০.৩৬৪) ও আফগানিস্তান (০.৩২১) অনেক পিছিয়ে আছে। এটা প্রমাণ করে হতদরিদ্র মানুষের জীবনমান ভয়াবহ সেখানে।
| দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর IHDI গ্রাফ |
এখানে আফগান আর মিয়ানমার যুদ্ধের কারণে একটু নিচের দিকে আছে। ভবিষ্যতে হয়তো আবার আমাদের চেয়ে উন্নত অবস্থানে চলে যাবে। এই উন্নতির রেখা বলতে গেলে সবসময় সরলরেখায়ই থাকে। মানে আমাদের উন্নতি আদতে মুখে মুখেই হয়। বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে।
এটা কী শতভাগ নির্ভুল?
না। এখানেও পাচার করা টাকার হিসাব বিবেচনায় আনা যায়নি। ধনকুবেরদের বেশিরভাগই নিজের সম্পত্তি গোপন করে। সুইচ ব্যাংকে বা ক্রিপ্টোতে টাকা রেখে দেয়, যা সরকারের ধরাছোঁয়ার বাহিরে রয়ে যায়। তবু এটা থেকে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মান পাওয়া যায় কোনো দেশের বর্তমান পরিস্থিতির।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন