নিজেকে জানতে চান? তাহলে পড়ুন...
আপনি কি নিজেকে চেনেন? আপনার নাম, ধর্ম বা রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের কথা বলছি না। আপনার ব্যক্তিত্বের কথা বলছি।
মানুষ এখনও অভিযোজিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়তো আরো বিকশিত হবে। তবে এখনও সেই সুযোগ আসেনি। তাই বলতেই হয় মানবদেহ অন্য প্রাণীর থেকে উন্নত হলেও সে নিজের সাপেক্ষে উন্নত না।
মানে, বুঝিয়ে বলছি। আমাদের সবার একটা দুর্বলতা আছে। এর কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, মস্তিষ্ক শরীরের মাত্র ২% অংশ হলেও সে একাই শরীরের শক্তির ২০% খরচ করে ফেলে। এখন আপনি যদি মগজ পরিমাণের বেশি খাটান তবে আপনার শরীর হবে দুর্বল আর পরিশ্রম বেশি করলে মগজ খাটানোর সুযোগ পাবেন কম। ঠিক এই কারণেই যারা কায়িকশ্রম করে তারা খুব অল্প সময়ে ঘুমিয়ে পরে।
মগজের এই দুটো দিককে ভিত্তি করে, চারটা গুণ বের করা হয়েছে প্রাচীনকালে। যা আজও আমাদের ব্যক্তিত্বের চার মানদণ্ড হিসেবে টিকে আছে। এগুলো হলো- মেধা, সাহসিকতা, সামাজিকতা আর স্থিতিশীলতা। (সময়ের সাথে সাথে আরো অনেক মানদণ্ডই যোগ-বিয়োগ হয়েছে) এই চারটার কম-বেশি কম্বিনেশনে অভিযোজিত হয়েছে প্রতিটা মানুষ। কারো কোনোটা কম, কোনোটা বেশি।
আমাদের মগজ কোনোদিন সবাইকে একই কাজ করতে ডিজাইনই করা হয়নি। এই চারটার কম্বিনেশনেই টিকে আছে মানবজাতি। মেধা না থাকলে কোনোদিন আগুন আবিষ্কার হতো না, বাড়ি-ঘর বানানো হতো না, এমনকি মানুষ লিখতে শিখতো না। সাহসিকতা না থাকলে বন্য পশুর বা অন্য মানুষদের আক্রমণ থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে পারতো না। সামাজিকতা না থাকলে মানুষের মতবিরোধে সবাই ঝগড়া করে যার যার মতো আলাদা হয়ে যেত, কেউ অন্যকে খুশি করতো না। আর স্থিতিশীলতা বা নিজেকে একটা সহজ জীবন দেয়ার এই মগজ না থাকলে পরিবার গড়ে উঠতো না; সবাই যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াতো।চার ধরনের মগজের সমন্বয়েই গড়ে উঠে সমাজ। শুধু আদিম কালে না আধুনিক কালেও টিকে আছে। সবসময় টিকে ছিল। সমাজে মেধার যোগান দেয় বিজ্ঞানী-লেখক-দার্শনিক, সাহসিকতা সৈনিক, সামাজিকতা দেয় নেতা-অভিনেতা-ব্যবসায়ী আর স্থিতিশীলতা দেয় কৃষক-শ্রমিক-আম জনতা।
এই গুণ বংশপরম্পরায় আসে না, আসে না লিঙ্গভেদে; আসে আপনার ডিএনএর কম্বিনেশন অনুসারে।
আইনিস্টাইনের একটা উক্তি ছিল, “মাছকে যদি গাছে চড়ার পরীক্ষায় বসানো হয় সে নিজেকে অযোগ্যই ভেবে যাবে আজীবন।”
আমাদের সবার সাথেও একই ঘটনা ঘটে। কেউ হয়তো পড়তে আগ্রহী, কেউ ঘুরতে, কেউ মানুষের সাথে মিশতে, কেউবা আবার স্বাভাবিক জীবনে কাজ করতে। কিন্তু আমাদের সবাইকে এক ক্লাসে বসিয়ে গাছে চড়ার পরীক্ষা নেয়া হয়। সে পাখি, মাছ, প্রাণী নাকি সরিসৃপ তা দেখার সময় তাদের নেই।
- পুঁজিবাদীদের ছড়ানো মিথ্যা
পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি- প্রবাদটা শুনেছেন নিশ্চয়ই? এটা এতবার শুনেছেন আশা করি সত্যের মতোই শোনায় এখন। বাস্তবতা ভিন্ন। আপনার চেয়ে রাজমিস্ত্রি কিংবা শ্রমিক অনেক বেশি পরিশ্রমী। কিন্তু আসল সৌভাগ্য তাদের হাতের মুঠোয় থাকে যারা সবাইকে বিভ্রান্তিতে রাখতে পারে যে তারা আমাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে।
এজন্য অনেক সময় এই শ্রেণী নিরাপত্তার অজুহাতে মিথ্যে শত্রুও বানিয়ে আমাদের সামনে রেখে দেয়। যেমন মার্কিন নেতাদের দেখানো অভিবাসী আর মধ্যপ্রাচ্য, ভারতের নেতাদের দেখানো পাকিস্তানী আর মুসলমান ও মিয়ানমারের দেখানো রোহিঙ্গা। আমাদের দেশেও আছে। হাসিনার আমলে দেখানো রাজাকারের বংশধর বা বিএনপি-জামায়াত আর বর্তমান আমলে লীগের দোসর-র-গুপ্ত তেমন শত্রুর উদাহরণ। যাদের তারা দেখছে বলে দাবি করে কিন্তু ক্ষমতা নিজেদের হাতে থাকা সত্যেও নিজে কখনো তাদের বিরুদ্ধে মাঠে নামে না, শুধু অন্যদের বুঝায় তারা বিপদে আছে। তাদের নিরাপত্তা দরকার। নেতা, ব্যবসায়ী, ব্যাংক, কারখানা মালিক সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য কথাটি। তারা এভাবেই টিকে থাকে।
চাকরিতে শুধু বুদ্ধিমানদেরই নেয়া হয়, এই ধারণাটাই ভুল। আপনি চাকরির ভাইবায় রিজেক্ট হবার কারণ হতে পারে আপনি আপনার নিজের দক্ষতা কোনটা তাই হয়তো সনাক্ত করতে পারেননি। হতে পারে আপনি ঐ চাকরির জন্য যেই আইকিউ দরকার আপনার উল্টো তার চেয়ে বেশি আছে।
জানলে অবাক হবেন, “বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকায় মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থদের পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা হয়েছিল কিন্তু যুদ্ধে বাছাইয়ের বাহিরে রাখা হয়েছিল বেশি আইকিউর ব্যক্তিদের। যে গুটি কয়েক উচু আইকিউধারী ছিল, তারা ছিল যুদ্ধের কমান্ডে। কারণ তাদের মগজ না, শরীর প্রয়োজন ছিল। যারা শুধু অর্ডার মেনে মরতে চলে যাবে। এক্ষেত্রে সাহসিকতা আর স্বাভাবিক জীবনের প্রতি লোভ কাজে এসেছে।
কঠোর পরিশ্রম করেও চাকরিতে প্রমোশন না পেয়ে অন্য কাউকে প্রমোশন পেতে দেখার কারণ হতে পারে এটাই। আপনি কোম্পানির হাত, মগজ নন। তারা এই হাতকে প্রমোশনের মুলা দেখিয়ে অনেক বেশি কার্যকর করে রেখেছে।
- মেধা ও সামাজিকতার পাল্লা
খেয়াল করেছেন, যারা মেধাবী হয় তারা একটু অসামাজিক হয়। মেধাবীরা একা থাকতে ও চিন্তা করতে বেশি পছন্দ করে। অন্যদিকে যারা মানুষকে সহজেই পটিয়ে ফেলতে পারে তারা নতুন কিছু সচরাচর করে না বললেই চলে।
আপনি মেধায় এগিয়ে নাকি সামাজিকতায়? নিচের পাল্লাটা আপনার ঝোঁক আর পাথরগুলো আপনার মস্তিষ্কের অংশ বোঝাচ্ছে।
আপনার মেধার পাল্লা হালকা হবার মানে এই না আপনার কোনো প্রয়োজনই নেই। এটা লজ্জার কোনো বিষয় না। সবাইকে আবিষ্কারক বা বুদ্ধিজীবী হতে হবে না। নিজের প্রতি সৎ থাকলেই আপনি আপনার বাস্তবতা আবিষ্কার করতে পারবেন।
- সাহসিকতা ও স্থিতিশীলতার পাল্লা
এমন বৈপরীত্য এখানেও দেখা যায়। যারা এডভেঞ্চার পছন্দ করে তারা একঘেয়ে জীবনে হাঁপিয়ে ওঠে, অন্যদিকে যারা নিরাপদ জীবন পছন্দ করে তারা আলাদা পরিস্থিতি থেকে পালানোর বাহানা খোঁজে।
আপনি এডভেঞ্চার বেশি পছন্দ করেন নাকি স্বাভাবিক জীবন?
আপনার নিজেকে আপনি জেনে গেলে, তো আপনি জীবনের পথে অর্ধেক এগিয়ে গেছেন। নিজের কাজের আসল ক্ষেত্র চিহ্নিত করুন।
সাহসিকতা কম হওয়া লজ্জার কিছু না। এটা স্বাভাবিক। এটা আপনাকে ও আপনার প্রিয় মানুষদের বিপদ থেকে দূরে রাখার জন্য তৈরি মস্তিষ্কগত ফায়ারওয়াল।
তা কী সিদ্ধান্ত নিলেন? আপনাকে কোন কাজের জন্য বেছে রেখেছে প্রকৃতি? মেধা, সামাজিকতা, সাহসিকতা নাকি স্বাভাবিকতা?


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন