কোন সাহিত্যের কবিতার নিজস্ব স্টাইল কোনটা?
বাংলা সাহিত্যের কবিতা সিগন্যাচার স্টাইল বা নিজস্ব স্টাইল হলো পয়ার। প্রতিটা সাহিত্যেরই একটা না একটা সিগন্যাচার স্টাইল থাকে।
এখানে বলে দেই, পয়ার কবিতা হলো ১৪ অক্ষরের লাইন নিয়ে গঠিত কবিতা।
আরো বিস্তারিত লিখেছি “কখন একটা লেখা কবিতা হয়ে উঠে?” ব্লগে। এখানে আর সে বিষয়ে বলবো না। আজ অন্যান্য সাহিত্য নিয়ে লিখতে বসেছি। বাংলায় সেগুলোর উদাহরণ দেয়ারও চেষ্টা করবো। কোথাও কোথাও নিজেও লিখে দেখাবো।
- গ্রিক সাহিত্য: এপিক বা মহাকাব্যের জন্ম এই সাহিত্যেই। এপিলিয়ন নামের সংক্ষিপ্ত মহাকাব্যও তাদের সিগন্যাচার স্টাইল। গ্রিক মিথোলজিকে আজও টিকিয়ে রাখতে বড় অবদান আছে এসব মহাকাব্যগুলোর।
এত বিশাল উদাহরণ দেয়া তো সম্ভব না। বাংলা সাহিত্যের এপিক ‘মেঘনাদবধ কাব্য’। আর বাংলা সাহিত্যের প্রথম এপিলিয়ন আমার ‘সিলেট জয়ের নৈপথ্যে’ হবে। এটা বাংলা সাহিত্যে এখনও আসেনি।
বাংলা মহাকাব্য বিষয়ে আরও বিস্তারিত আগেই লিখেছিলাম। চাইলে এই লিংক থেকেই পছন্দমতো অন্য কোনো বাংলা মহাকাব্য ডাউনলোড করে পড়ে দেখতে পারবেন।
- ইতালীয় সাহিত্য: সনেট হলো, ইতালীয় সাহিত্যের সিগন্যাচার স্টাইল। খুব সহজ ভাষায় যদি বলি, সনেট হলো ১৪ লাইনের একটা মিত্রাক্ষর কবিতা, যার প্রথম ৮ লাইনে প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয় আর শেষ ৬ লাইনে করা হয় মন্তব্য। প্রথম ৮ লাইনে একটা ছন্দকাঠামো থাকে পরের ৬য় লাইনে আরেকটা। এটুকুই।
সনেট প্রথম লিখেছিল ইতালির সিসিলীয় কবি ও আইনজ্ঞ জাকোমো দা লেন্টিনি। কিন্তু এই সনেট নামের কবিতার ধারাকে জনপ্রিয় তিনি করেননি। করেছিলেন আরেক ইতালীয় জনপ্রিয় কবি ফ্রান্সেস্কো পেত্রার্ক। তাই তাকেই সনেটের জনক বলা হয়।
পরবর্তীতে অন্যান্য সাহিত্যেও শুরু হয় সনেট লেখা। মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলায় নিয়ে আসেন সনেটকে, আরও কিছু শর্ত জুড়ে দিয়ে। যেটা একই সাথে পয়ার ও সনেট।
বাংলা সনেটে এছাড়াও প্রমথ চৌধুরী আর ফররুখ আহমেদের অবদান সর্বোচ্চ।
মাইকেল বাবু যেহেতু নতুনদের জন্য একটু কঠিন হবে তাই আমরা নাহয় প্রমথ চৌধুরীর কাছেই হাত পাতি। তিনি ‘সনেট’ নামেই আস্ত একটা সনেট লেখে বসে আছেন।পেত্রার্কা-চরণে ধরি করি ছন্দোবন্ধ,যাঁহার প্রতিভা মর্ত্ত্যে সনেটে সাকার।একমাত্র তাঁরে গুরু করেছি স্বীকার,গুরুশিষ্যে নাহি কিন্তু সাক্ষাৎ সম্বন্ধ!নীরব কবিও ভাল, মন্দ শুধু অন্ধ।বাণী যার মনশ্চক্ষে না ধরে আকার,তাহার কবিত্ব শুধু মনের বিকার,এ কথা পণ্ডিতে বোঝে, মূর্খে লাগে ধন্ধভালবাসি সনেটের কঠিন বন্ধন,শিল্পী যাহে মুক্তি লভে, অপরে ক্ৰন্দন॥ইতালীর ছাঁচে ঢেলে বাঙ্গালীর ছন্দ,গড়িয়া তুলিতে চাই স্বরূপ সনেট।কিঞ্চিৎ থাকিবে তাহে বিজাতীয় গন্ধ,—সরস্বতী দেখা দিবে পরিয়া বনেট!আর আমার সনেটগ্রন্থ ‘মহাকাল’-তো এই ব্লগে ফ্রীতেই পড়া যায়।
- ইংরেজি সাহিত্য: ইংরেজি সাহিত্যের সিগনেচার স্টাইলের নাম ব্ল্যাংক ভার্স। সংস্কৃতের মন্দাক্রান্তা ছন্দের মতো লঘু-গুরুস্বর নির্ভর ছন্দ এটি। ব্ল্যাংক ভার্সে ৫টি লঘু ও ৫টি গুরুস্বর নিয়ে গঠিত ১০টি সিলেবল থাকে কবিতার প্রতি লাইনে। এটা অমিত্রাক্ষর, অন্ত্যমিল থাকতে পারবে না, এটাই এটাকে ব্ল্যাংক ভার্স বানায়। এর লাইন সংখ্যা অনির্দিষ্ট। দুই লাইন থেকে শুরু করে আপনি মহাকাব্যও লিখতে পারবেন। বাংলায় এটা এখনও অনুপস্থিত। তবে মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমিত্রাক্ষরে লেখা কবিতাগুলো আর কালিদাসের মেঘদূতম্ এর ছন্দ জোড়া দিলে যা হবে তাই হবে এর সবচেয়ে নিকটতম আত্মীয়।
২ লাইনের একটা বাংলা ব্ল্যাংক ভার্স লেখছি-আন্ধার, বিদ্যুৎ নেই। থেমে আছেসবই। গরমে জাগছে নির্ঘুম ঘাম।আচ্ছা, গুরুস্বর আর লঘুস্বরটা বুঝাই। কোনো সিলেবল বা দলের শেষে অ, ই, উ, ঋ, এ বা ও উচ্চারণ হলে তা লঘুস্বর আর আ, ঈ, ঊ, ঐ, ঔ অথবা কোনো ব্যঞ্জনধ্বনি শেষে উচ্চারণ হলে তা গুরুস্বর। নিচে লঘু-গুরু সংক্ষেপে দেখানো হলো।গু-গু গু-গু ল-ল লল-গু-লআন-ধার, বিদ-দুত নে-ই। থেমে আছেগু-ল ল-ল-ল গু-ল গু-গু গুসব-ই। গ-র-মে জাগ-ছে নির-ঘুম ঘাম। - আরবি সাহিত্য: কাসিদা আরবি সাহিত্যের নিজস্ব ঢং। যেখানে ৫০ থেকে ১০০ লাইনের একটা দীর্ঘ কবিতা অন্তমিলগুলো কক বা কখ অন্তমিল একদম শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে। মানে কবিতার প্রতিটি লাইনে একই অন্তমিল থাকবে বা প্রতি জোড় লাইনের অন্তমিল একই হবে আর বিজোড় লাইনের অন্তমিলগুলোও একই রকম হবে।
এটা যেহেতু আকারে বড় পরে কোনো এক সময় লিখে দেখাবো। - উর্দু সাহিত্য: গাজয়াল বা গজল উর্দু সাহিত্যের সিগনেচার। আমরা যেটাকে গজল বলতে চিনি ঐটা আসলে গজল না, ঐটা আসলে হামদ বা নাত।
আসল গজল হলো আকারে ১০ থেকে ৩০ লাইনের এক বিশেষ ধরনের কবিতা। গজল শব্দের আসল অর্থ প্রেমালাপ। এগুলো অন্তমিল (কাফিয়া) অথবা অন্তমিল (কাফিয়া) আর একই শব্দের পুনরাবৃত্তি (রদিফ) ব্যবহার করে লেখা হয়।দুই লাইন-দু্ই লাইন করে একেকটি স্বাধীন ইউনিট। মানে ২য় বাক্যের বাড়তি অংশ পরের বেজোড় ঘরে যেতে পারবে না। প্রথম দুই লাইনে রদিফ ও কাফিয়া দুটোই থাকে। তারপর থেকে শুধু জোড় লাইনগুলোতে একই রদিফ ও কাফিয়া রিপিট হয়। এই নিয়ম মেনে শুধু অন্তমিল বা কাফিয়া দিয়ে লেখা হলেও তা গজল হতে পারে। একটা গজল লেখার চেষ্টা করি।তোমারও কী এমন করে মনে পড়ে?কেমন ছিলাম প্রেমের ঘোরে, মনে পড়ে?কত-শত খেয়ালী কথা, দুষ্টু-মিষ্টি হাসি-ঠাট্টাতোমার আমায় হাসির তোড়ে, মনে পড়ে?যখন অসুখ বাঁধাও অনিয়মে নিয়ম করেআমায় কী জ্বরের ঘোরে, মনে পড়ে?যখন কোনো সিনেমা দেখে উদাস মনেবসে থাকো চুপ করে, মনে পড়ে?
যখন কোনো যত্নে রাখা বইয়ের ভাঁজ
খুললে পরে স্মৃতিরা উপচে পরে, মনে পড়ে?
যখন তোমার একলা রাতে একলা লাগে
কেঁদে ওঠো নিয়ম করে, মনে পড়ে?এখানে রদিফ ‘মনে পড়ে’ শব্দটি আর কাফিয়া ‘মনে পড়ে’ শব্দটির আগের ‘রে’ যুক্ত শব্দগুলো। করে, ঘোরে, তোড়ে আর পরে এগুলো।
- হিন্দী সাহিত্য: দোহা হিন্দী সাহিত্যের প্রতিনিধি। মাত্র ২ লাইনের এই কবিতায় ১৩+১১=২৪ মাত্রার মাত্রাবৃত্ত কবিতা। এছাড়াও ৬ লাইনের কুণ্ডলিয়াও হিন্দী কবিতার একটা সিগনেচার স্টাইল। এটাও ১৩+১১=২৪ মাত্রার মাত্রাবৃত্ত কবিতা। যেখানে যেই শব্দ নিয়ে প্রথম লাইন শুরু হয়, শেষ লাইনের সমাপ্তিও টানতে হয় একই লাইন দিয়ে, অনেকটা কুণ্ডলীর মতো। এমনকি এর প্রথম দুই লাইনকেও দোহা বলা হয়। পরের ৪ লাইনকে বলে রোলা। দোহার শেষ অংশ দিয়েই আবার রোলার মানে ৩য় লাইনের শুরুটা করতে হয়।
একটা দোহা লিখে দেখাচ্ছি-তোমার সাথে আমার দেখা আবার (১৩) এটাকি নিছক কাকতালীয়? (১১)
ভাগ্য কেনো এমন করে, পালাই (১৩) যত? সে দুঃখের আত্মীয়? (১১)১৩ আর ১১ মাত্রা কিভাবে হলো না বুঝলে “কখন একটা লেখা কবিতা হয়ে উঠে?” ব্লগটা পড়ে আসতে পারেন।
- পারস্য সাহিত্য বা ফারসী সাহিত্য: রোবাইয়াত ফারসী সাহিত্যের এক সেরা সংযোজন। মাত্র ৪ লাইনের অর্থপূর্ণ কবিতা। খৈয়াম-হাফিজ-রুমিরা এই ধারাকে নিয়ে গিয়েছিল অনন্য উচ্চতায়। যেটা উর্দু সাহিত্যে এসে শায়রী নাম নিয়েছে।
নজরুল, কান্তিচন্দ্র, মুজতবা, ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহসহ অনেক বিখ্যাত কবি এসব রোবাইয়াত বাংলায় অনুবাদ করেছেন। তবে সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় রোবাইয়াত হলো, ওমর খৈয়ামের এই রোবাইয়াতটি।এইখানে এই তরুর তলে, তোমার-আমার কৌতুহলে
যেক’টি দিন কাটিয়ে যাবো প্রিয়ে।
সঙ্গে রবে সুরার পাত্র, অল্প কিছু আহার মাত্র
আরেকখানি ছন্দ-মধুর কাব্য হাতে নিয়ে।এই রোবায়েতটা আমি নিজেও অনুবাদ করেছিলাম। পোস্টের নিজে যে ৫টা কবিতার লাইন ঘুরেফিরে আসে তার মধ্যে একটা সেই কবিতা। - চীনা সাহিত্য: রোবাইয়াতের মতোই চীনের সিগন্যাচার স্টাইল ৪ লাইনের জুয়েজু। তবে এটা একটা গল্প বলে। এটার কোন লাইনে কি থাকবে তা নির্দিষ্ট।
আগের দুই লাইনে দৃশ্যপট থাকে আর শেষের লাইনে ঘটনার পরিবর্তন হয় আর একটা দর্শন বা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রেখে যায়। এটাকে ‘মাইক্রো-মুভি’ বলা হয়, এর নাটকীয় পরিবর্তনের কারণে।
বাংলা জুয়েজুর উদাহরণ হতে পারে আমার সিলেট জয়ের নৈপথ্যে’ এপিলিয়নের ২৮ নম্বর শ্লোকের এই চার লাইন। যদিও এটা মহাকাব্যের অংশ হতে যাচ্ছে, তবু এককভাবে চিন্তা করলে এটা জুয়েজু ধরনের।যখন তার মেয়ে বেহুশ জ্বরেঢেকেছে কবিরাজ কে তার ঘরে?কোথায় তার রাজা তখন, আরকোথায় ছিল এই পাহারাদার? - জাপানী সাহিত্য: জাপানী সাহিত্যের সিগনেচার স্টাইলে আরো কড়াকড়ি। নাম হাইকু। তিনলাইনের অণুকাব্য। ১ম লাইনে ৫টি, ২য় লাইনে ৭টি আর ৩য় লাইনে আসার ৫টি অক্ষর মিলে তৈরি হয় এত কবিতা। এত কম অক্ষর হবার কারণে কোনো ঘটনা সেখানে বলা যায় না। হাইকুগুলো সাধারণত আধ্যাত্মিক বা উপদেশমূলক হয়ে থাকে।
বাংলা সাহিত্যে তেমন দেখা যায় না, তাই নিজেই লিখে উদাহরণ দিচ্ছি-দেখা, না দেখা
জীবনের নিরীক্ষা
অদেখা শিক্ষা।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন