এখানে ভিলেন বানানো হয়...

আগেও বলেছি, নাটক-সিনেমার মতো কেউ আসলেই ভিলেন হয় আমি বিশ্বাস করি না। মানুষ বাইনারি ডিজিট না। হয় শূন্য, নয় এক। মানুষ অনেক জটিল একটা প্রাণী। সে বেড়ে ওঠা পরিবেশের বিশ্বাস ও আদর্শ নিয়ে। আসলে আমরা আমাদের প্রতিপক্ষকে খারাপ দেখাই যেন নিজেকে সেরা প্রমাণ করতে পারি। আসলে আমরা চাই আমাদের আদর্শ অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে।  এভাবেই জন্ম নেয় একেকজন ভিলেন বা হিরো।

আমাদের এই আদর্শের লড়াই এটাই আমাদের হিরো বানায় যারা সেই আদর্শে বিশ্বাসী তাদের কাছে আর যারা ‍অবিশ্বাসী তাদের কাছে বানায় ভিলেন। পশ্চিমারা আরব দেশগুলোকে বরাবর অসভ্য দেশ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে, অথচ কোনো কোনো দিক দিয়ে তারা যাদের নিয়ে পরিহাস করে তারা তাদের থেকে অনেক যোগ্য হলেও। আবার ভারত বাংলাদেশ-পাকিস্তানকে উপস্থাপন করে অস্থিতিশীল দেশ হিসেবে আবার বাংলাদেশে বসে দেখি ভারতই কাশ্মিরে মানুষ মারছে, স্লোগান তুলছে হিন্দুরাষ্ট্র হবে, নামাজ পরতে চাইলে পাকিস্তান চলে যাও। 

সবকিছুর মূলেই আসলে আদর্শগত পার্থক্য। আমার আদর্শ অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা।

ইতিহাসের জন্মও সেখান থেকেই হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইতিহাস বিজয়ীরাই লেখে, কারণ পরাজিতরা মারা পরে। আর মৃতরা কথা বলে না। ফলে ইতিহাস পরাজিতদের ভুলগুলোতে আলোকপাত করে। প্রয়োজনে না পেলে বানিয়ে নেয় নিজের ইচ্ছে মতো।

আপনি যদি মোঘল ইতিহাস উর্দু বইয়ে পড়েন তবে তা হবে ইতিহাসের স্বর্ণযুগ, কিন্তু হিন্দীতে পড়লে তা হবে হিন্দুদের ওপর চরমবৈষম্য। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বাংলা বইগুলোতে যেমন পাই মোঘলরা মোটেই তেমন ধর্ম প্রচার করতে আসেনি।

তারা এসেছিল রাজত্ব করতে। তারা খেলাফত কায়েম করতে আসেনি কখনো। ওসমানীয় খেলাফতের পর তার হাল মোঘলরা ধরেনি। যদি তারা ধর্মপ্রচার করতে আসতো তবে তাদের ক্ষমতার কেন্দ্র দিল্লিতেই আজ সব মুসলিম থাকতো, কিন্তু মুসলিমরা ছিল নিপীড়িত সব অঞ্চলে। আকবরের নজরে পড়া ঈসা খাঁর রাজত্ব কী মুসলিম প্রধান ছিল না? তাতে কেন তার নজর দিতে হবে মারাঠাদের রাজ্যে নজর না দিয়ে। কারণ তার আদর্শ বলছিল  এটা জয় করলে লাভ আছে। তাহলে আমাদের ইতিহাসই কি শুধু ভুল? হিন্দীরটা?

ঐটাও নিজের ছকে বসিয়ে বানানো। আধুনিক যে হিন্দু ধর্ম তার জন্মই হয় মোঘল আমলে। মোঘলরা যখন এসে দেখলো এখানে কিছু মানুষ আছে যারা নিজেদের বড় মানে, অন্যদের নিজেদের গ্রন্থ ছুঁতে দেয় না তখন তাদের মনে হলো আরে বিষয়টা তো কমন পড়ছে। তারা আগ্রহী হয় ঐ ধর্মের প্রতি। তারাই প্রথম মহাভারত অনুবাদ করেছিল। গীতাকে তারা বিশ্বাস করেছিল এই এলাকায় জন্মানো কোনো নবীর ওপর নাজিল হওয়া মিসিং কোডেক্সের অংশ। যার কারণে তারা এসব দেশীয় জনগোষ্ঠিগুলোকে একত্র করতে শুরু করে। সিন্ধুকে তারা উচ্চারণ করতো হিন্দু বলে, সেখান থেকে তারা এই ধর্মের নামই দিয়ে দিলো হিন্দু। এর আগে বিচ্ছিন্ন আদিবাসি যারা নিজ নিজ এলাকার নদনদীর পূজা করতো, কেউ হয়তো ভাবতেও পারেনি তারা এক ছাতার তলে চলে আসবে। কেউ মাংস খায়, কারো কাছে মাংস ছোঁয়াও পাপ, কারো আবার শুধু নিরামিষ খাওয়ারই অধিকার আছে। স্রষ্টা নিয়েও তারা বিভ্রান্ত, কারো কাছে দূর্গাই সব, কারো কাছে শিব, কারো কাছে কালি, তো কেউ রাম বা কৃষ্ণের মতো অবতারকেই স্রষ্টা মনে করে। এই ধারাবাহিকতায় আকবর নিজেই হিন্দু মেয়ে বিয়ে করা বা হিন্দু-মুসলিম মিলিয়ে নতুন ধর্ম বানিয়ে ফেলার কথা কে না জানে? একই কাজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবাও করেছিলেন ব্রহ্মধর্ম নামে এক নতুন ধর্মের প্রচারণা চালিয়ে।

আদতে মুসলিমদের না হিন্দুদেরই মোগলদের কাছে ঋণ বেশি। কিন্তু পরিস্থিতি উল্টো। মুসলিমরা তাদের পক্ষে সাফাই গায় আর হিন্দুরা করে তিরস্তার। আসলে এখানে কারা কোনো মানুষ না, তারা একটা মানদণ্ড। আমরা নিজেদের মানদণ্ডে মাপি সে হিরো বা ভিলেন। ভারতীয় হিন্দুরা মানতে চায় না কারণ কী? কারণ তাদের পর মেজর পাওয়ার মুসলিমদের। আর মুসলিমদের ভিলেন বানিয়ে উপস্থাপন করতে কাউকে তো চাই।

একই কথা বাংলাদেশেও প্রযোজ্য। হিন্দুদের কোনো মত পছন্দ না হলেই বলে দাও সে র এর এজেন্ট বা ভারতের দালাল। আমার আদর্শ ঠিক প্রমাণ করতে আমি অন্যকে ভিলেন বানালাম।

পশ্চিমা বিশ্বের বর্তমানে মাদক-পর্নে মিলিয়ে যা তা পরিস্থিতি। যার ফলে আমেরিকায় বর্তমানে কয়েদির সংখ্যা আকাশছোঁয়া। কিন্তু তাকে মধ্যপ্রাচ্যেই অপরাধীর খোঁজে আসতে হয়। কেন? আদর্শ।

আপনার কী মনে হয় ট্রাম্প, নেতানিয়াহু বা পুতিন তারা তাদের নিজেদের অপরাধী মনে করে? না। তারা নিজেদের সেরাই বিশ্বাস করে। কারণ তার আদর্শ সে তেমনভাবেই মগজে সেট করে নিয়েছে। আপনি চাইলেও তাদের সে আদর্শ পরিবর্তন করতে পারবেন না। একই কারণে মার্কিনিরাও ইরানকে দমাতে পারছে না। কারণ তাদের আদর্শেও তারা ঠিক।
কাল যদি ২য় বিশ্বযুদ্ধের জার্মান-ইতালি-জাপানের মতো আমেরিকা-ইসরায়েলেরপতন হয় তাদের হিটলার বা মুসোলিনির চেয়ে ভালোভাবে উপস্থাপন করা হবে না, বিশ্বাস করুন। তবে কিছু কিছু পরবর্তী সময়ে একই আদর্শের মানুষ তাদের পক্ষে সাফাই গাইবে না তাও কিন্তু নয়।

বিজয়ী অবস্থায়ই যদি তারা মারা যায় তাদের কেউ ভিলেন বানাতে সাহস পাবে না। ডব্লিউ. বুশের কথা মনে আছে, যিনি সেকুলার ইরাকের রাষ্ট্রনায়ক সাদ্দামকে সামরিক অগ্রাসন চালিয়ে খুন করেছিল তাদের কাছে ভয়াবহ অস্ত্র আছে বলে। সেই অস্ত্র কোনোদিন দেখাতে পারেনি, কিন্তু কোনো নাটক-সিনেমায় তাকে ভিলেন বানানো হয়েছে? যেই নাইন-ইলিভেনকে কেন্দ্র করে মুসলিম দেশগুলোতে তারা অগ্রাসন চালিয়েছিল সেই হামলায় বেশিরভাগ মানুষ সৌদি আর একজন লিবিয়ান ছিল। তাহলে ইরাক, আফগান, পাকিস্তান, সিরিয়ায় এত যুদ্ধ কিসের হলো? আদর্শের। তারা বরাবরই মুসলিমদের অসভ্য প্রমাণ করার চেষ্টা করছে, অথচ আমেরিকা যখনও তারা দখল করেনি তখনই তারা বীজগণিত, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা আবিষ্কার করে ফেলেছিল। মাঝ সমুদ্রে বা মরুভূমিতে নিজের অবস্থান আবিষ্কার করতে বানিয়েছিল এস্ট্রোল্যাব নামের এক যন্ত্র। যেটা দিয়ে দিক নির্ণয়, সময় নির্ণয়, নিজের অবস্থান, সূর্য ও শুকতারার সঠিক অবস্থান, কেবলার দিক, হিসাব-হিকেশ সব করা যেতো। যেগুলো আমরা আজ আধুনিক ডিভাইস ছাড়া কল্পনাও করতে পারি না। আর তাও এক দ্বীপে আটকা পড়ে চার্জ শেষ হয়ে গেলে অকেজো। অথচ তারা শুরু করে দিয়েছিল নৌ-পথে বাণিজ্য। পৃথিবীর প্রথম রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল যেখানে, যেখানে লেখা আবিষ্কার হয়েছিল, যেখানে লেখা হয়েছিল প্রথম সংবিধান সেই মধ্যপ্রাচ্যকে অসভ্য প্রমাণের চেষ্টা কেন? আদর্শ। আমরা নিজেদের সেরা প্রমাণ না করতে পারলে আমরা টিকে থাকতে পারবো না। যোগ্যতমের ঊর্ধ্বক্রম।

ইতিহাসের আয়না হলো, শিল্প-সাহিত্য। কিন্তু মজার বিষয় হলো শিল্প-সাহিত্য কোনো স্ট্যান্ডার্ড বিষয় না। আধুনিককালের সিনেমার কথাই ধরুন না। ঐখানে আমরা আরও সহজে নিজের আদর্শ অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারি। একই ক্লাসিক সাহিত্য বলিউড বানালে তা হবে মিউজিকাল, হলিউড বানালে সেক্স ফ্যান্টাসি আর ফ্রান্সে বানানো হলে তা ইরোটিকা। উদাহরণ হিসেবে আরব্য রজনীর কথা চিন্তা করতে পারেন। বলিউডের সিন্দাবাদ, আলাদিন, আলিফ লায়লা আর হলিউডের আরাইয়ান নাইট্স, আলাদিন, সিন্দাবাদের সাথে তুলনা করুন। আমি ফ্রান্সেরটা দেখতে বলবো না, আমাদের রূচিতে আসার মতো না। কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তি যেমন সুলতান সালাহ উদ্দিন আইয়ুবির কথাই ধরুন। হলিউডের কিংডম অব হেভেনে তিনি একদল উচ্ছৃঙ্খল সৈনিকের নেতৃত্ব ‍দিচ্ছেন, আরব প্রযোজনার সালাহ আল দ্বীন আল আইয়ুবিতে তিনি দারুণ কূটনৈতিক ও দক্ষ শাসক আবার বলিউডে তিনি এসে পদ্মাবতে তিনি কাঁচা মাংস খেঁকো আর নারীলোভী। কোনো মানুষের পেটে কাঁচা মাংস হজম করার ক্ষমতা নেই এটুকু অন্তত মাথায় রাখা দরকার ছিল। যাই হোক, প্রত্যেকে নিজ নিজ মনের মাধুরী মিশিয়ে একজনকে আদর্শ বা আদর্শবিরোধী বানাতে যা যা করা দরকার তার কোনো কমতি রাখেনি। 

কেন?

কারণ অন্যকে ছোট না দেখালে নিজের আদর্শ চাপিয়ে দেয়া যায় না। সেদিন আর কোনো যুদ্ধ থাকবে না যেদিন আমরা আমাদের আদর্শ অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা বন্ধ করে দিবো।  

 

মন্তব্যসমূহ

ফারহান সাদিক (সংগ্রাম) এর কাব্যগ্রন্থ ‘সিলেট জয়ের নৈপথ্যে’, ‘কালিদাসের মেঘদূতের প্রমিত অনুবাদ’ আর ‘গোরস্তানের দারোয়ান’ নিয়ে কোনো প্রকাশনী কাজ করতে চাইলে যোগাযোগ করুন।
FS Quote